মাসকাওয়াথ আহসান

সাধুদের গ্রামে সততার সুবাতাস থৈ থৈ করছে। এমন সততার উদ্ভাস এর আগে এতোটা চোখে পড়েনি। গ্রামের প্রতিটি মানুষই এক একটি বাণী চিরন্তনী। কিশোরদের কারো লম্বা চুল দেখলে সাধুরা নাপিত ডেকে তা কেটে দেয়। কোথাও কিশোর-কিশোরীকে গল্প করতে দেখা গেলে; সাধুরা তাদের ধরে থানায় দিয়ে আসে।

সাধুদের গ্রামের মূল্যবোধের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ কোন বিষয় সাধুরা একেবারে সহ্য করতে পারে না। কেউ যদি বলে, কিশোর-কিশোরীদের তাদের বয়সোচিত আনন্দে বড় হতে দিন। এতে বুড়ো বয়েসে গিয়ে তাদের কোন মনোবিকলন ঘটবে না। সাধুরা অমনি ফোঁস করে ক্ষেপে ওঠে, তুমি কে হে আমাদের সাধু গ্রামে এমন অসাধু কথা বলো!

অন্য সাধুরা যোগ দেয়, ঠিক মতো দেখে রাখুন; কারা এসব অসাধু পরামর্শ দেয়। আমাদের গ্রামের হাজার বছরের সাধুতার ঐতিহ্যকে শক্ত করে ধরে রাখুন। আমরা কোন বেলেল্লাপনাকে প্রশ্রয় দেবো না।

এক কিশোর গিয়ে সাধুর সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করে, সাধু আপনি কী জন্ম থেকেই এমন বিশুদ্ধ বুড়ো। আপনার কী কোন কৈশোর কাল ছিলো না!

সাধু সাধুদের গ্রামের বিশুদ্ধ রূপকথার ঝাঁপি খুলে বসে, আমি জন্মগ্রহণের পরপরই আমাকে শিশু সাধু বলে ঘোষণা করা হয়। এরপর কিশোর-যুবা-প্রৌঢ় সাধু হয়ে আজ আমি বৃদ্ধ সাধু।

কিশোর জিজ্ঞেস করে, তা আপনার জন্ম কী করে হলো!

–আর বোলো না; আমার আম্মা সকালের প্রার্থনা সেরে ফুলের বাগানে পরিচর্যার সময়; বকুল তলায় দেখেন একটি ফুটফুটে শিশু কাঁদছে। সেটাই আমি ছিলাম।

–তা এ গ্রামের সব সাধুকেই কী বকুল তলায় পেয়েছিলেন তাদের মায়েরা!

–সে তো বটেই। বকুল তলার শিশুরাই সাধু হয়।

–আমার জন্ম হাসপাতালে হয়েছে! আমি কী আর সাধু হতে পারবো!

–তাহলে তো হবে না বাপু। তুমি বড় জোর সাধুর সেবক হতে পারবে। তবে আমাদের দেখে বিশুদ্ধ গুণাবলী অর্জনের চেষ্টা করতে পারো।

–সাধুগ্রামের সাধুদের বাড়িগুলো প্রাসাদোপম; আর কৃষক-শ্রমিকদের বাড়িগুলো কুঁড়ে ঘর! এই বৈষম্য কী সাধুতা!

–সাধুতার কারণে ঈশ্বর সাধুদের প্রাসাদ উপহার দেন। আর অসাধুদের তিনি গরীব করেন। সবই ঈশ্বরের লীলা!

–লীলা কী সাধু! এক কিশোরকে এক কিশোরীর সঙ্গে গল্প করতে দেখে, এক সাধু তাদের পুলিশে দিয়ে বলেছিলেন, এরকম প্রেমলীলা এ গ্রামে চলবে না!

–ঈশ্বরের লীলা পবিত্র বিষয়। আর কিশোর-কিশোরীদের প্রেমলীলা অপবিত্র বিষয়।

সাধুদের গ্রামে ঈশ্বরের লীলাকে আর কেউ প্রশ্ন করে না। কারণ ধনী-গরীবের বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন করলে; ঈশ্বর অবমাননার নামে সাধুরা অবমাননাকারীকে পুলিশে দিয়ে দেন।

সাধুরা কেবল পছন্দ করেন, প্রেমলীলা নিয়ে প্রশ্ন তোলা! তাই সাধু সেবক হতে দলে দলে লোকে প্রেমলীলা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

‘প্রেমলীলা’ নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রায় সাধুর মর্যাদা পেয়ে যায় সাধারণ মানুষ। ফলে সাধুদের গ্রামে স্টেটাস সিম্বল হয়ে দাঁড়ায় ‘প্রেমলীলা’ নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়টি।

সাধুদের গ্রামে নিয়মিত ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তাতে অনেক সাধু ধরা পড়ে। আইনি লড়াইয়ে সাধুদের মুক্তির সুযোগ অবারিত। অনেক সাধু বলেন, নারীর পোশাক আর চলাফেরায় ধর্ষণের কারণগুলো লুকিয়ে থাকে। নারী হচ্ছে আইসক্রিমের মতো। তাতে কাগজের মোড়ক চাই; তাকে ফ্রিজে রাখতে হবে। ঈশ্বর সেটাই পছন্দ করেন।

এইভাবে সাধুগ্রামে ধর্ষণলীলার জনপ্রিয়তা বাড়ে। শিশু-বৃদ্ধা এমনকী মোড়কে ঢাকা নারী কেউ-ই নিরাপদ নয় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এক কিশোর সাধুর বাটিতে এসে জিজ্ঞেস করে, সাধু পৃথিবীর যেসব গ্রামে এতো বিশুদ্ধ সাধুতার কড়াকড়ি নেই; সেখানেই দেখি উদ্ভাবক আর বিজ্ঞানী তৈরি হয়। তারাই সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়। আর আমরা সাধুগ্রামের লোকেরা শুধু তাদের উদ্ভাবিত পণ্য কিনে ব্যবহার করে বেঁচে থাকি!

সাধু কিশোরটিকে সাবধান করে দেন, শয়তান তোমাকে এসব ভাবাচ্ছে। প্রার্থনা করো, তুমি যেন শয়তানের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসতে পারো। মনে রাখবে সাধুদের গ্রাম নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঈশ্বরের ভীষণ অপছন্দ। তুমি অভিশপ্ত।

কিশোর জিজ্ঞেস করে, কী করে আমি এই অভিশাপমুক্ত হতে পারি সাধু!

সাধু বলেন, তুমি ঈশ্বরের সেবায় আমাদের ‘ফুচকি দেয়া স্কোয়াডে’ ভর্তি হও। তোমার গবেষণার বিষয় হচ্ছে ‘প্রেম-লীলা’ ধরা। ফুচকি দিয়ে ‘প্রেম-লীলা’-র গুরুতর অপরাধ চিহ্নিত করতে পারলেই তুমি ঈশ্বরের আশীর্বাদ পাবে।

ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেতে কিশোর যোগ দেয় সাধুর ফুচকি দেয়া স্কোয়াডে। সাধুদের গ্রামের বিনোদনহীন জীবনের কারাগারে এই ফুচকিটাই একমাত্র বিনোদনের উপাদান হয়ে দাঁড়ায়।

কিছুদিন পর কয়েকটি কিশোর সাধু প্রবর্তিত ‘ফুচকি’ ও ‘রগড়’ ক্যাটাগরির পদক পায়।

সাধু তাদের সম্বর্ধনা সভায় বলেন, হাজার বছরের বিশুদ্ধ সাধুতার রক্ষাকবচ আমাদের ফুচকি ও রগড় বীরেরা। পৃথিবীর কোন গবেষণা কিংবা উদ্ভাবন এইসব বীরকর্মের সমকক্ষ নয়। ঈশ্বর তোমাদের সম্মানিত করলেন; আমরা সাধুরা তো ঈশ্বরের মাধ্যম মাত্র।

0 Shares