মাসকাওয়াথ আহসান

বাংলাদেশে ২-৩ শতাংশ কট্টর ইসলামপন্থী আছে; যারা ইসলামি স্টেটের স্বপ্ন নিয়ে ঘোরাঘুরি করে; এরা পাকিস্তান ও অধুনা মিশরকে ইসলামি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিভূমি বলে মনে করে; এরা বিএনপিকে ভোট দেয়।

আর আছে ২-৩ শতাংশ কট্টর হিন্দুত্ববাদী; যারা হিন্দু স্টেটের স্বপ্ন নিয়ে ঘুরে; এরা ভারতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভিত্তিভূমি বলে মনে করে; এরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়।

এরা উভয়েই ধর্মীয় কট্টরপন্থী হওয়ায়; সোশ্যাল মিডিয়ায় এরা অত্যন্ত কট্টর মনোভাব নিয়ে হাজির হয়। নিজস্ব চিন্তা ও বিশ্বাসে স্থবির এরা। বিন্দুমাত্র স্থিতিস্থাপকতা নেই অভিমতের ক্ষেত্রে।

এরা একে অপরের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ করে। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিয়ে একটিভিজম করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দলদুটির জনপ্রিয়তা হ্রাস করে।

স্যোশাল মিডিয়ার গুজব আর প্রোপাগান্ডার কারখানাটি এরা চালায়। এরা এমন রাশির লোক যে যাকে সমর্থন করবে; সেই জনপ্রিয়তা হারাবে। ফলে বাস্তবের ভারত বা পাকিস্তান যতটুকু আদিম কট্টরপন্থী; তার চেয়ে আদিমতর হিসেবে ধরা দেয় সাধারণ মানুষের মনে। আর বাস্তবের ভারত ও পাকিস্তান তো ভুগছেই সেখানকার ২-৩ শতাংশ হিন্দুত্ববাদি ও ইসলামপন্থীর সতত গুজব, প্রোপাগান্ডা, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, ঘৃণা-বিদ্বেষের বিষে।

বাংলাদেশের ইসলামপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী দুটি শিবিরের সমস্যা আদি ও অকৃত্রিম। নিজেকে অপরের চেয়ে বড় করে দেখানো। কেবল এই একটি জীনসঞ্জাত রোগ না থাকলে সম্ভবত এই লোকগুলো কট্টরজীবনের পাতকূয়ায় সারাজীবন কাটাতে বাধ্য হতো না।

এরা একে অপরকে সারাক্ষণ ‘মালাউন’ বনাম ‘ম্লেচ্ছ’ বলে গালাগাল করে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুর্নীতি বিপ্লবে এরা দারিদ্র্য সীমার নীচ থেকে চকিতে লাফ দিয়ে নব্য-মধ্যবিত্ত ও নব্য- উচ্চবিত্ত হওয়ায়; এরা ‘দখল’ ও ‘লুন্ঠন’-এর রাজনীতিকে ধর্মের মালা পরিয়ে একে পবিত্র করে তুলতে চায়।

এদের কাছে ‘মানবতা’ অত্যন্ত সিলেক্টিভ। রোহিঙ্গা’র মানবতা হিন্দু কট্টরপন্থীর বিন্দুমাত্র বিবেচনার বিষয় নয়। আবার হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃস্টান-আদিবাসীর মানবতা কট্টর মুসলমানের বিন্দুমাত্র বিবেচনার বিষয় নয়। ফলে এই দুটি শিবিরে দানবতার চর্চা প্রকট। ফেসবুকে নিজ নিজ টাইমলাইনে এদের সিলেক্টিভ মানবতা ও দানবতার অপরাধের চিহ্ন খুব স্পষ্ট।

হিন্দু কট্টরপন্থী আজো বেঁচে আছে সেই হিন্দু রাজা-জমিদারদের সোনালী যুগে। যখন জমিদার বাবু চেয়ারে বসে মুসলমানদের মাটিতে ছালা পেতে দিতেন ‘ইনফেরিয়র’ প্রজা করে বসিয়ে রাখতে। অন্যদিকে মুসলমান কট্টরপন্থী ঠিক সেই যুগের স্মৃতিতে তিক্ত পরশ বুলিয়ে প্রতিশোধ নিতে উন্মুখ। অথচ সেসব সময় বদলে গেছে কত আগে। সত্যিকার বোধ সম্পন্ন বিপুল সংখ্যক মানুষ; হিন্দু-মুসলমান আত্মপরিচয়ের ঘেরাটোপের বাইরে গিয়ে ‘মানুষ’ হিসেবে পরস্পরের সঙ্গে মেলামেশা করে এসেছে দীর্ঘকাল ধরে।

কিন্তু কট্টরপন্থী দলদুটো ইতিহাসের কাঁটাটাকে ‘অতীত’-এর তিক্ত ক্ষণে আটকে দিয়ে বিভাজনের খেলা চালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। দক্ষিণ এশিয়ায় বৌদ্ধ মন্দির ভেঙ্গে হিন্দু মন্দির নির্মাণ আবার হিন্দু মন্দির ভেঙ্গে মুসলমানদের মসজিদ নির্মাণের অনেক প্রত্ন চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো অতীত ইতিহাসের তিক্ত স্মৃতি। কিন্তু ভারতের হিন্দুত্ববাদি সরকার সমর্থকেরা আজকাল ইতিহাসের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত।

এই যে ইতিহাসের সঙ্গে যুদ্ধের প্রবণতা; এটা বাংলাদেশেও দৃশ্যমান। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার বাংলাদেশে ন্যায় বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিলো। আর কেউ কখনো যেন এদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাহস না করতে পারে; সেটা নিশ্চিত করতে একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের বিচার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিলো। কিন্তু ইতিহাসের একটি সিলেক্টিভ যুগক্ষণের মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের মাঝ দিয়ে তো বাংলাদেশের মানবতাবিরোধী অপরাধ থেমে যায়নি। অথচ ইতিহাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে ‘কেবল একাত্তরের অপরাধই অপরাধ; সমকালের অপরাধ তেমন কিছু নয়; এমন একটি দায়মুক্তি দেবার মনোভাব বিনির্মিত হয়েছে।

একাত্তরের অপরাধীদের বিচারের বিপক্ষে ছিলো আলোচিত ২-৩ শতাংশ ইসলামি কট্টরপন্থী। এই যে অপরাধ অস্বীকার প্রবণতা এটি কট্টরপন্থার উপজাত।

এই বিচারের পক্ষে ছিলো ২-৩ শতাংশ কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী। এরা একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে ইসলাম ধর্মকে একীভূত করে ফেলতে চেষ্টা করেছে তাদের প্রচারণায়। এই একই হিন্দুত্ববাদিরা ‘গুজরাটে’ মোদির মানবতা বিরোধী অপরাধ বা কাশ্মীরে মোদির দখলদারিত্বকে দু’হাত পা তুলে সমর্থন জানায়।

যেহেতু কট্টরপন্থী দুটি শিবির জমজ ভাইয়ের মতো; কাজেই একপক্ষের জ্বর হলে তখন আরেকপক্ষেরও জ্বর হয়। একপক্ষের হিন্দু কট্টরপন্থীদের হিন্দুত্ববাদি মোদির গর্বের পতাকার পাশাপাশি অন্যপক্ষটি তুরস্কের কট্টর ইসলামপন্থী নেতা এরদোয়ানের গর্বের পতাকা ওড়ায়।

এদের পচনশীল চিন্তার গোড়াটা একই জায়গায়; নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের কল্পনা আর অন্যের ধর্মকে ছোট করার পাতকূয়া রোগ। এদের মুখে সবসময় ‘জাত গেলো গেলো রব’। দক্ষিণ এশিয়ার কাস্ট সিস্টেমের অধঃক্ষেপ মুখে নিয়ে এরা কে কার চেয়ে সুপিরিয়র তা প্রমাণে মারমুখী।

এই কট্টরপন্থীরা পশ্চিমা দেশে গেলেও মগজের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন নিয়ে যায়। এরা ইউরোপে গিয়েও ওয়াজ-মেহেফিল বা পূজা-অর্চনা করে নিজের কথিত উন্নত জাতের গর্বের পতাকা ওড়ায়। বিদেশে গেলে এদের ‘লা গোবরিনা’ ফেস্টটি আরো ছড়িয়ে যায়। একে অপরকে চাড্ডি-ছাগু-কাংলা-পাকি ইত্যাদি নানা গালাগালে সাজিয়ে তোলে। এর মাঝ দিয়ে দক্ষিণ এশিয় কট্টর ‘ফইন্নির পুতে’র বিরাট জাতে ওঠার বিকট প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু বিধি বাম-সৃষ্টি কর্তা যেহেতু এদের চেহারায় দক্ষিণ এশিয় গ্রাম্যতার ট্রেডমার্ক ছেপে দিয়েছেন; ট্রেনে ট্রামে বাসে বাংলাদেশের কট্টরপন্থী মুসলমান, ভারতের কট্টরপন্থী হিন্দু ও পাকিস্তানের কট্টরপন্থী মুসলমান নির্বিশেষে পশ্চিমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ‘পাকি’ গালিটি খেয়ে যায় গজিয়ে ওঠা হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের কাছে।

পশ্চিমা রেসিজমের চাপে পড়ে তখন তারা একযোগে পশ্চিমের লিবেরেল বা উদারনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন করে, ভোটে তাদের জেতাতে প্রাণ পাত করে। আর অখণ্ড ইউরোপের ধারণা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত বিহীন দেশগুলো দেখে আনন্দে শিহরিত হয়।

কিন্তু নিজ নিজ গ্রামে ফেরা মাত্র বা অধুনা প্রচলিত ফেসবুকে চালিয়ে যায় নিজ নিজ জাতের শ্রেষ্ঠত্বের গল্প। ঘৃণা-বিদ্বেষ ফ্যাক্টরি হিসেবে সচল থাকে। দক্ষিণ এশিয়া যেন অনন্তকাল ধরে বিভাজিত থাকে; সেই প্রচেষ্টায় মানুষের মনের মধ্যে তৈরি করতে থাকে বিভাজনের দেয়াল; ঘৃণা-বিদ্বেষ-প্রতিহিংসার কাঁটাতার।

0 Shares