দীপ্ত সুন্দ অসুর

আমরা চার বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম।ঐ একটি আইডিয়ার উপর ভর করে। নিজেদের বেশ রোমাঞ্চিত লাগছে।তাছাড়া আমাদের বয়সটা এখন চাকরির খোঁজে নিয়োজিত থাকার কথা।লোকমতে,ভবিষ্যৎ তা না হলে অনিশ্চিত।আমরা এই অনিশ্চয়তার পথেই পা বাড়ালাম।যদিও প্রতিবন্ধকতা ছিল,ছিল অনেক অনুৎসাহী ঘটনা।তবুও ওই একটি আইডিয়া আমাদের মাথায় এমন ভাবে গেঁথে গেছে যে মনে হচ্ছে পরিবর্তন কেবল উক্ত পথেই সম্ভব।তাই বলে আমরা এক মত নিয়েই পড়ে থাকি না।বার বার প্রশ্ন ওঠে, পালটে যায় দিক। তবে কিছু একটা করতেই হবে এই হচ্ছে শেষ কথা।

ও বলা হয় নি। আমরা চারজন মিলে একটা স্কুল খুলেছি।এখন নতুন শিক্ষক-শিক্ষিকা সেখানে তাদের কাজ করছেন।আমাদের প্রথম লক্ষ্যছিল এটাই। অন্তত একটা সাফল্য।আমরা তা পেয়েছি এবং পাচ্ছি।সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে চলে আমাদের পাঠদান।ছেলে-মেয়েদের নির্ধারিত পাঠ্যবই থাকলেও আমরা নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করি। যেহেতু প্রাথমিক স্কুল সেহেতু বাচ্চাদের শিখন উপযোগী অনেক উপকরণ আমাদের সৃজনশীল শিক্ষক শিক্ষিকারা তৈরি করেছেন।না,স্কুলের কথা পরে একদিন বলব।
আমাদের উদ্দেশ্য জেলা শহরের লাইব্রেরি সংলগ্ন কোথাও ৩-৪ মাসের জন্য থেকে শিক্ষা বিষয়ে গবেষণা করা এবং পরবর্তি কর্মসূচি প্রণয়ন করা। আর তারপর কাজে নেমে পড়া।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার এক বন্ধু ছিল।ওর নাম প্রণয়।শুনেছি ওর বাড়ি জেলা শহরে। অন্য এক বন্ধুর কাছ থেকে ফোন নাম্বার জোগাড় করে ওর সাথে যোগাযোগ করলাম। ও তো আমাদের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল।বলল,তোরা সত্যি পাগল হয়েছিস।
নয়ন আর সজীব কে ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। ওরা গ্রামে থেকেই পড়াশুনা করেছে। আমাদের দুই বছরের জুনিয়র। তবে এখন সবাই মাইন্ডগত ভাবে এক। আমাদেরকে নতুন কিছু করতে হবে। দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্টের মূলে যে বিশ্বাস(ধর্মীয়,প্রথাগত) তাকেই সমূলে উৎপাটিত করতে হবে। নতুনকে সাদর আহবান জানানোর মত মগজ তৈরি করতে হবে প্রজন্মের মধ্যে।

যাইহোক,এ শহরের গলিপথ থেকে অট্টালিকা প্রণয়ের চেনা সব।শেষমেষ লাইব্রেরি থেকে হেটে পাঁচ-ছয় মিনিটের মত হবে এমন দুটি রুম ভাড়া করলাম।যদিও ভাড়া পেতে একটু বেগ পেতে হয়েছিল।তবুও যা পেয়েছি তাতেই আমাদের কাজ খুব ভালোভাবে হবে।
পরদিন নয়ন আর সজীবকে রান্নার জন্য সব কিছু কিনে দিয়ে আমি আর সোহেল বেরিয়ে পড়লাম -লাইব্রেরির উদ্দেশ্যে।আগেও দুই একবার এসেছি। তবে এমনভাবে না। এবার লাইব্রেরিয়ানের সাথে তো কথা বলতেই হবে।জানালাম, আমাদের দুই মাস কিংবা প্রয়োজনে তারও একটু বেশি সময় নিয়ে লাইব্রেরি ব্যবহার করার পরিকল্পনার কথা। লাইব্রেরিয়ান কিন্তু দারুণ উৎসাহী মানুষ।আমাদের সব কিছু দেখিয়ে দিলেন। আমি সোহেলকে বললাম, “সোহেল,আমাদের কিন্তু গবেষনার বিষয়বস্তু ঠিক করে ফেলতে হবে।আমাদের এককভাবে এবং সম্মিলিতভাবে -এই ভাবেই কাজ করতে হবে।দেশ পাল্টাবার নতুন পথ খুজে বার করবই।তবে একটা ব্যপারে সাবধান থাকতে হবে,আমাদের উদ্দেশ্য গুলো আমাদের ভিতরেই থাকবে।এখন আমরা শুধু জানব।”
তারপরেরটুকু যোগ করল সোহেল,”তারপর মুক্তচিন্তা বিস্তারে নেমে পড়বো, জনারণ্যে।বুদ্ধিতে আমরা জিতব।মৌলবাদীরা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতার কাছে পরাজিত হবেই। আমরা তেমনি এক পথ খুঁজে বের করব।খুঁজব রাজনীতির পট পরিবর্তনের কৌশল। ”
আমি জানি এভাবে আমরা নানা স্বপ্নের জাল বুনতে পারব। কিন্তু না, এখন আমরা শুধু শিখব আর জানবো।
ওদিকে নয়ন আর সজীবও দেখি রান্না করতে করতে আসর জমিয়ে নিয়েছে।সকালের খাওয়ার সময় বাড়ি মাকে ফোন করলাম।মা তো আগেই ফোন ধরে বলছে,”কিছু খেয়েছিস?”
আমি বললাম, “না, খাব।লাইব্রেরি থেকে আসলাম।”
“নে, সবাইকে নিয়ে খেয়ে নে। ওরা বাড়ি কথা বলেছে?”
-“বলেছে।মা,তুমি খেয়ে নিও ঠিকমত।”
আমি জানি মা রা এক আধটু বাধা দেয়ই।কিন্তু সে বাধা মানা সব সময় তো আর যায় না।
স্নান করে সবাই খেতে খেতে আজকের দিনের পরিকল্পনা ঠিক করে ফেললাম।
সজীব বলল,”দাদা,আমরা মনে হচ্ছে পারবই।”
ওর কথা শুনে আমার আনন্দে কেমন বুক ভরে ওঠছিল।
যে মুক্তচিন্তা আজ বিপর্যস্ত দিকে দিকে। আমার এই বন্ধুরা এখনো স্বপ্ন দ্যাখে মুক্তমনা সমাজ প্রতিষ্ঠার!
“অনেকে বলে আমরা এতখানি পড়াশুনা শিখে করলাম কি?
না,তাদের প্রতি কোন ক্ষোভ নেই তবে আমাদের কাজ দেখে তারাই একদিন চমকে উঠবে।”নয়ন আস্তে আস্তে বলল।

আমি এক গ্লাস মুখে দিয়ে যেন গভীর শান্তিতে ডুবে যাচ্ছিলাম।

0 Shares