শিবাংশু দে

অন্ধকার ফিরে এলে যাঁদের দিকে আলোর জন্য তাকাই, তাঁদের একজন আজ সাড়ে পাঁচশো বছর পূর্ণ করলেন। তাঁর জন্মদিনকে লোকজন আলোর উৎসব বলে। একজন বিস্ময়কর মানুষ। যাঁর দেশে জন্মেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করি। আজকের এই ভারতবর্ষে, যখন আলো জ্বালাতে গেলেই বারবার নিভে যায়, সেই অন্ধতার আবহে তাঁর আসনের আলো আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। আজ বোধ হয় ভাবা যাবেনা, পাঁচশো বছর আগের এই দেশ কী ধরনের জাতিদ্বেষ, হিংস্র রক্তপাতের বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলো। সেই আবহে শাশ্বত ভারতবর্ষের পতাকা কাঁধে নিয়ে যাঁরা হেঁটে গেছেন সারাদেশ জুড়ে, তিনি ছিলেন তাঁদেরই একজন।

সে একটা সময় ছিলো বটে।

দিল্লির সুলতান, বিখ্যাত বা কুখ্যাত তুর্কি মুহম্মদ বিন তুঘলক আর নেই। নিহত হয়েছেন ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলকের হাতে। সেই ফিরোজ শাহ তুঘলকও মারা গেলেন ১৩৮৮ সালে। দিল্লির মসনদে প্রায় রোজ রাজাবদল। সীমান্তের ওপারে বহুদিন ধরেই অপেক্ষা করছিলেন তুর্কো-মোঙ্গল যুদ্ধব্যবসায়ী তইমুর লংগ। ১৩৯৮ সালের শীতকালে তিনি আক্রমণ করলেন দিল্লি। তৎকালীন সুলতান মাহমুদ শাহ পালিয়ে বাঁচলেন। কিন্তু আট দিনের দিল্লি অবরোধে এক লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হলো এবং লুণ্ঠিত হলো সব সম্পদ। একজন মুসলিম শাসকের হাতে এতো মুসলিমের রক্তচিহ্ন বোধ হয় এদেশ প্রথম দেখেছিলো তখন। হিন্দু, হিন্দুর সঙ্গে নেই, মুসলিম, মুসলমানের সঙ্গে নেই। মানুষ মানুষের সঙ্গে নেই। ইতিহাসের ঘোর অন্ধকার পর্ব শুরু হয়েছিলো সেদিন।

গুরু নানকের জন্ম ১৪৬৯ সালে । তাঁর ‘জন্মসাক্ষি’ পঞ্জী বেশ নিষ্ঠা সহকারে গ্রন্থিত আছে। সেখানে দেখছি তাঁর প্রথম দেশযাত্রা, যাকে শিখরা ‘উদাসি’ বলে থাকেন, সেটি ছিলো ১৫০০ থেকে ১৫০৭ সালের মধ্যে। এই সময়ই গুরু নানক বারাণসিতে সন্ত কবিরের সঙ্গ করেছিলেন। গুরু নানকের সঙ্গী ছিলেন ভাই মর্দানা, একজন মুসলিম। এর ঠিক আগেই ১৪৯৯ সালে গুরু নানকের ইষ্টদর্শন হয় এবং তিনি প্রচার করতে থাকেন, ঈশ্বর তাঁকে বলেছেন জগতে হিন্দুও নেই, মুসলমানও নেই, শুধু ‘আমি’ আছি। তাই নানক সমস্ত প্রচলিত ধর্মমতকে অস্বীকার করে ‘ঈশ্বরের’ শিষ্য হিসেবে নিজেকে উৎসর্গ করেন। শুধুমাত্র ভক্তি ও প্রেমের মাধ্যমেই যে মানুষের উত্তরণ ঘটে সেই আদর্শই তিনি সন ১৫০০ থেকে ১৫২৪ পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষ, তিব্বত, মধ্য এসিয়া, আরবদেশ ও শ্রীলংকায় প্রচার করেন। গুরু নানক যখন বারাণসিতে এসেছিলেন, তখন সন্ত কবিরের খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা মধ্যগগনে। কারণ গুরু নানকের ধর্মমত যেসব সাধকের চিন্তন ও বোধিপুষ্ট, সন্ত কবির তার মধ্যে প্রধান। গুরু গ্রন্থসাহিবে সর্বাধিক গ্রন্থিত রচনা সন্ত কবিরের বাণী থেকেই সংগৃহীত।
শিখদের শবদকীর্তন আমার প্রিয় সঙ্গীতধারা। গুরু নানকের প্রতি উৎসর্গিত গুরু অর্জনদেবের এই শবদটি আমি নিত্য শুনে থাকি। অনেকেই গেয়েছেন অতি লোকপ্রিয় গানটি। সারল্যের গভীরতা যে কতোটা গভীরগামী বারবার প্রমাণ করে দেয় এই কটা শব্দ। অন্ধকারে পথ দেখায়।

Koi Bole Ram Ram Koi Khuda (Shabads) – Ustad Nusrat Fateh Ali Khan

https://www.youtube.com/watch?v=sqUaAYOax_Q

শ্রদ্ধেয় ভাই নির্মল সিং খালসা থেকে শুরু করে সব বিশিষ্ট রাগীরা গানটি গেয়ে থাকেন নানা রাগে। গুরু গ্রন্থসাহিবে গানটি রাগ রামকেলিতে গাইবার নির্দেশ আছে। বিশেষত স্বয়ং নুসরত ফতে আলি খান সাহেবের বর্ণাঢ্য গায়নে সবাই শুনেছেন এই শবদ। যদিও শবদকীর্তন গাইবার একটা নিজস্ব শৈলী রয়েছে। শিখ গায়করা সনিষ্ঠভাবে সেটা মেনে চলেন। কিন্তু কব্বালি শৈলীতেও গানটিকে একই রকম নিবেদিত প্রত্যয়ে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। রিয়াজভাই কব্বালের নিবেদনটি আমার ভালো লাগে তার সারল্যের জন্য। একজন সনাতনধর্মীয় গুরুর প্রতি নিবেদিত সনাতনধর্মীয় শিষ্যের শবদ, যেটি শিখদের একটি শ্রেষ্ঠ ধর্মসঙ্গীত, গেয়েছেন একজন মুসলিম, যিনি থাকেন মার্কিন দেশে। গাইছেন একটি গুরুদ্বারায়, শিখ, মুসলিম ও হিন্দু ভক্তদের সামনে। একেই আমি ভারতবর্ষ বলে জানি। মনে থাকে মুসলিম তুর্কি শাসকদের হাতে সব চেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়েছিলেন শিখসম্প্রদায়ের মানুষই। কিন্তু তাঁরা কখনও ভুলে যাননা মানবতাবাদই আমাদের ধর্ম। আমাদের অন্তিম সিদ্ধি। অন্ধকারে পথ খুঁজে পাই ,
অব্বলে আল্লাহ নূর পায়া, কুদরতকে সব হি বন্দে,

এক নূর সে সব জগ উপজায়া, কওন ভলে কওন মন্দে…

https://www.youtube.com/watch?v=CX2zwHjXgrI

কোঈ বোলে রাম রাম, কোঈ খুদায়ী
কোঈ সেবৈ গুসইয়া, কোঈ অল্লহায়ী
কারণ করণ করিম, কিরপা ধার রহিম ।।

কোঈ নাওয়ে তিরথ, কোঈ হজ জাওয়ে,
কোঈ করে পূজা, কোঈ সর নিভায়ে,
কোঈ পঢ়ে বেদ, কোঈ কতেব,
কোঈ ওঢ়ে নীল, কোঈ সপেদ,
কারণ করণ করিম, কিরপা ধার রহিম।।

কোঈ কহে তুরক, কোঈ কহে হিন্দু,
কোঈ বাছে ভিসত, কোঈ সরগেন্দু,
কহ নানক জিন হুকম পছাতা,
প্রভ সাহব কা তিন ভেদ জাতা,
কারণ করণ করিম, কিরপা ধার রহিম ।।
(গুরুগ্রন্থসাহিব-৮৮৫ পৃষ্ঠা)

(কেউ বলে রাম রাম, কেউ নেয় খুদার নাম,
কেউ ভজে গোসাঁই, আর কেউ আল্লাহ
তিনিই সব কারণের কারণ, দয়াময় প্রভু
তাঁর কৃপাধারায় আমরা ধন্য হই।।

কেউ করে তীর্থস্নান, কেউ হজে যায়,
কেউ পূজা করে, কেউ নতশির প্রার্থনায়,
কেউ পড়ে বেদ, কেউ বা কতেব (কুরান),
কেউ পরে নীল জামা, কেউ বা সফেদ,
তিনিই সব কারণের কারণ, দয়াময় প্রভু
তাঁর কৃপাধারায় আমরা ধন্য হই।।

কেউ বলে তুর্কি, কেউ বলে হিন্দু,
কেউ খোঁজে বেহস্ত, কেউ বা স্বর্গলোক,
নানক বলে যারা প্রভুর আদেশ বোঝে,
তারাই তাঁর রহস্য জানতে পারে,
তিনিই সব কারণের কারণ, দয়াময় প্রভু
তাঁর কৃপাধারায় আমরা ধন্য হই।।)

Koi Bole Ram Ram / Govinda Jaya Jaya – Jahnavi Harrison with Kirtan at London

https://www.youtube.com/watch?v=1C6Fsvy21cg

 

 

0 Shares
শিবাংশু দে এর ব্লগ   ১৫ বার পঠিত