ভজন সরকার

 

 

রবীন্দ্রনাথের গানের জনপ্রিয়তা

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পরে অনেক বছর (তর্ক-বিতর্ক নিয়েই বলা যায় ২০ বছর তো হবেই) রবীন্দ্রনাথের গানের জনপ্রিয়তা কিছুটা কমতির দিকেই ছিল। এ সময়েই জানা যায়, গ্রামোফোন রেকর্ডস কোম্পানি ‘হিস মাস্টার্স ভয়েস‘ (HMV) শিল্পীদের রবীন্দ্রনাথের গানের পরিবর্তে আধুনিক গান গাইতে বলেন।  সে সময়েই দেবব্রত বিশ্বাস “এই কুত্তার ছাপ  মার্কা কোম্পানিতে গান  রেকর্ড করুম না” ব’লে চলে আসেন। তারপরে দেবব্রত বিশ্বাস হিন্দুস্তান রেকর্ডিং কোম্পানি থেকে পরপর অনেকগুলো গান রেকর্ড করেন, যে গানগুলো পরবর্তীতে খুব বিখ্যাত হয়েছিল, যেমন আকাশভরা সূর্য্যতারা, যেতে যেতে একলা পথে, গায়ে আমার পুলক লাগে, পুরানো সেই দিনের কথা, এ মণিহার আমায়, আমি যখন তাঁর দুয়ারে, তোমার দ্বারে কেন আসি, পুরানো জানিয়া চেয়োনা, অনেক দিনের আমার যে গান ইত্যাদি ।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে  বাঙালির রবীন্দ্রপ্রীতি যেন নতুন করে জেগে উঠলো। পূর্ব বাংলা তথা তখনকার পূর্ব-পাকিস্তানে তো সরকারি রোষানলকে বৃদ্ধাংগুলি দেখিয়ে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপিত হলো রবীন্দ্র কবিতায় ও গানে বাংলাদেশকে ভাসিয়ে দিয়ে। আর কোলকাতায় শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ নামে চারখণ্ডের একটি সিডিতে তখনকার বাংলা গানের সব বিখ্যাত শিল্পীরা গাইলেন।

যদিও ৪০ ও ৫০ এর দশকে অনেক বিখ্যাত শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড ক’রে সাধারণের কাছে পৌঁছে দিয়ে জনপ্রিয় করতে সহায়তা করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, পঙ্কজকুমার মল্লিক, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দোপাধ্যায় প্রমূখ। তাছাড়া, চলচ্চিত্রে  ব্যবহারও রবীন্দ্রনাথের গানের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেই  প্রমথেশ বড়ুয়া পরিচালিত ‘মুক্তি ( ১৯৩৭ )’ সিনেমায় পঙ্কজ কুমার মল্লিক চারটি গান ব্যবহার করেছিলেন । গানগুলো হলো , ‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে[১]‘, ‘তার বিদায়বেলার মালাখানি[২], ‘আমি কান পেতে রই[৩]  এবং ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে‘। শেষের গানটি  আবার পঙ্কজ কুমার মল্লিক নিজেই সুরারোপ করেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ তাতে অনুমোদনও দিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের গান চলচ্চিত্রে সবচেয়ে সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন সত্যজিত রায়। কিন্তু প্রবাদপ্রতিম আরেক চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক তাঁর বিখ্যাত কয়েকটি সিনেমায় রবীন্দ্রনাথের গান দেবব্রত বিশ্বাসকে দিয়ে গাইয়েছিলেন ৬০-র দশকের প্রথম দিকে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর আগেই।  ‘মেঘে ঢাকা তারা  (১৯৬০)’ সিনেমায় গীতা ঘটকের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে দেবব্রত বিশ্বাস গেয়েছিলেন ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি[৪] আর  ‘কোমলগান্ধার (১৯৬১, মার্চ)’  সিনেমায় ‘আকাশভরা সূর্যতারা[৫]-ও গেয়েছিলেন দেবব্রত বিশ্বাসই। যদিও আরও অনেক অনেক পরে ঋত্বিক ঘটকের আরেকটি সিনেমা ‘যুক্তি তর্ক ও গল্প (১৯৭৭)’-তে দেবব্রত বিশ্বাসের সেই বিখ্যাত গান ‘কেন চেয়ে আছ গো মা[৬]  তো জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছিলো সে সময়। গানটি ব্যবহার হয়েছিল ঋত্বিক ঘটকের ওষ্ঠেই।

আর সত্যজিত রায় তো কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীতকে সার্থকভাবে ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে জনপ্রিয়তা তুংগে তুলে দিয়েছিলেন। যেমন, ‘ঘরে বাইরে’তে  ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি[৭] কিংবা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ সিনেমাতে ‘এ পরবাসে রবে কে[৮] কিংবা ‘জনারণ্য’  সিনেমাতে ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে[৯]। এরপরে কে না ব্যবহার করেছেন রবীন্দ্রনাথের গান  তাঁর সিনেমা কিংবা নাটকেও?

চলচ্চিত্রকার বা নাট্যকার তো বটেই, এমন কোন বাংলা গানের (হিন্দি গানেরও বটে) সংগীতশিল্পী হয়তো নেই যিনি রবীন্দ্রনাথের গান করেননি এবং যাঁকে দিয়ে রেকর্ড কোম্পানিগুলো দ্বারা রবীন্দ্রনাথের গান করানো হয়নি। লতা, আশা, কিশোরকুমার তো বটেই, রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেই পঙ্কজ কুমার মল্লিক অবাঙালি সংগীতশিল্পী কুন্দনলাল সায়গালকে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে নিয়ে আসেন। কুন্দনলাল সায়গাল (যিনি কে এল সায়গল নামেই পরিচিত) বাংলা শুদ্ধ উচ্চারণে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে প্রশংসাও পেয়েছিলেন বলে জানা যায়।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে মহাত্মা গান্ধী (শান্তি নিকেতন, ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ)। ফটোক্রেডিট: The Positive Encourager

 

(২)

প্রপিতামহ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে  তিনি বিলেত থেকে চলে আসেন কলকাতায়। আর সে বছরই বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) আন্দোলনে কলকাতা উত্তাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি নিয়ে গান লিখেছেন ‘বাংলার মাটি বাংলার জল‘। রবীন্দ্রনাথের এ গান গেয়ে তিনি বঙ্গভঙ্গ-এর বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন।

যদিও তার পরের বছরই তিনি আবার বিলেত চলে যান ব্যারিস্টারি পড়তে কিন্তু আইন পড়া বাদ দিয়ে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেন পাশ্চাত্যসংগীতে ও যন্ত্রসংগীতে। ফিরেও আসেন  বছরখানিকের মধ্যেই। এসেই তালিম নেন  ভারতীয় উচ্চাংগসংগীতের এবং পরে রবীন্দ্রসংগীতের অবশ্যই।

রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির নেশায় একের পর এক গান রচনা করেছেন এবং সুরও করেছেন তাৎক্ষণিকই। কিন্তু যে মানুষটি রবীন্দ্রনাথের এ সৃষ্টিকে সংরক্ষণ ক’রে অনাগতকালের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর সম্বন্ধে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন,

“তার ( দিনেন্দ্রনাথ) চেষ্টা না থাকলে আমার গানের অধিকাংশই বিলুপ্ত হোত। কেননা নিজের রচনা সম্বন্ধে আমার বিস্মরণ শক্তি অসাধারণ। আমার সুরগুলি রক্ষা করার এবং যোগ্য এমনকি অযোগ্য অপাত্রকে সমর্পণ করা তার যেন সাধনার বিষয় ছিল। তাতে তার কোনদিন ক্লান্তি ধৈর্যচ্যুতি হতে দেখিনি”।

সম্পর্কে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন রবীন্দ্রনাথের নাতি। বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র দ্বিপেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে। জন্মেছিলেন ১৮৮২ সালে। ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ শ্রুতিধর ছিলেন। ফলে রবীন্দ্রনাথের  কাছ থেকে সুর একবার শুনেই  নির্ভুলভাবে লিখে রাখতেন। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্বন্ধে তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। রবীন্দ্রনাথও বলেছেন সে কথা,

“দিনেন্দ্রনাথের কণ্ঠে আমার গান শুনেছি, কিন্তু কোনোদিন তার নিজের গান শুনি নি। কখনো কখনো কোনো কবিতায় তাকে সুর বসাতে অনুরোধ করেছি, কথাটাকে একেবারেই অসাধ্য ব’লে সে উড়িয়ে দিয়েছে। গান নিয়ে যারা তার সঙ্গে ব্যবহার করেছে, তারা জানে সুরের জ্ঞান তার ছিল অসামান্য। আমার বিশ্বাস গান সৃষ্টি করা এবং সেটা প্রচার করার সম্বন্ধে তার কুণ্ঠার কারণই ছিল তাই। পাছে তার যোগ্যতা তার আদর্শ পর্যন্ত না পৌঁছয়, বোধ করি এই ছিল তার আশঙ্কা।“

যদিও জানা যায়, প্রায় ১৩টির মতো গান দিনেন্দ্রনাথ রচনা ও সুর করেছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথের গান, ডি, এল রায়ের গান, কীর্তন, বাউল ইত্যাদি গানেও ছিলেন পারদর্শী। ১৯২৬ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি দিনেন্দ্রনাথের কিছু গান রেকর্ড ক’রে প্রকাশ করেন।

তার আগেই ১৯১৫ সালে ‘ফাল্গুনী’ গীতিনাট্য দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে  উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথ। উৎসর্গ পত্রে লিখেছিলেন,

“যাহারা ফাল্গুনীর ফল্গুনদীটিকে বৃদ্ধকবির চিত্তমরুর তলদেশ হইতে উপরে টানিয়া আনিয়াছে তাহাদের এবং সেইসঙ্গে সেই বালকদলের সকল নাটের কান্ডারী আমার সকল গানের ভান্ডারী শ্রীমান দিনেন্দ্রনাথের হস্তে এই নাট্যকাব্যটিকে কবি-বাউলের একতারার মতো সমর্পণ করিলাম “।

রবীন্দ্রনাথের ‘সকল গানের ভাণ্ডারী’ দিনেন্দ্রনাথ  বিশ্বভারতীর সংগীতভবনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন। পরে শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানেও শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। যদিও পরে বিভিন্ন পারিবারিক টানাপোড়নে শান্তিনিকেতন এবং রবীন্দ্রনাথের সাথে তাঁর দূরত্ব সৃষ্টি হয়। রবীন্দ্রনাথের গানের সুর পরিবর্তনের অভিযোগও  আসে তাঁর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে  ইন্দিরাদেবীর সাথে চিঠিপত্রে রবীন্দ্রনাথ কিঞ্চিৎ অভিযোগ করলেও দিনেন্দ্রনাথের প্রজ্ঞার প্রতি রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস ছিল।  তাই দিনেন্দ্রনাথের  লেখা স্বরলিপিতেই রবীন্দ্রনাথ অনুমোদন দিতেন। কিন্ত কিছু গানের সুর যেমন ‘বিশ্ববীণারবে বিশ্বজনে মোহিছে’ রবীন্দ্রনাথ  তাঁর আপত্তির কথা ইন্দিরাদেবীকে জানিয়েছিলেন চিঠিতে।

কিন্ত রবীন্দ্রনাথের গান এমন সুচারুভাবে সংরক্ষণ করে তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার যে গুরু দায়িত্ব দিনেন্দ্রনাথ পালন করেছেন, রবীন্দ্রনাথ সেকথা কৃতজ্ঞচিত্তেই মনে রেখেছিলেন। তাই অতি অল্প বয়সে ১৯৩৫ সালে যখন তাঁর জীবনাবসান হয়,তখন রবীন্দ্রনাথ ভীষণ বেদনাহত হয়ে লিখেছিলেন,

“এই আশ্রমকে আনন্দনিকেতন করবার জন্য তরুতলার শ্যাম শোভা যেমন, তেমনি প্রয়োজন ছিল সংগীতের উৎসবের। সেই আনন্দ উপচার সংগ্রহের প্রচেষ্টায় প্রধান সহায় ছিলেন দিনেন্দ্র। এই আনন্দের ভাব যে ব্যাপ্ত হয়েছে, আশ্রমের মধ্যে সজীবভাবে প্রবেশ করেছে, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়ে চলেছে এর মূলেতে ছিলেন দিনেন্দ্র। আমি যে সময়ে এখানে এসেছিলাম তখন আমি ছিলাম ক্লান্ত, আমার বয়স তখন অধিক হয়েছে। প্রথমে যা পেরেছি শেষে তা-ও পারি নি। আমার কবিপ্রকৃতিতে আমি যে দান করেছি সেই গানের বাহন ছিলেন দিনেন্দ্র।”

 

(৩)

রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে যেটুকু  উন্মাদনা শিক্ষিত বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে  আজ দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকতে সেটুকুও দেখা যায় নি। এ প্রসংগে রবীন্দ্রনাথের আক্ষেপের  কিছু বর্ণনা পাওয়া যায় ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত কিছু পত্রে। এক পত্রে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,

“আমার গানের পক্ষ নিয়ে তোমার দুঃখলাভ বা সম্মানহানি ঘটে এ আমি ইচ্ছে করি নে। যে বীজ নিজে রোপন করেছি তার ফলের দায়িক আমি একলা। তার জন্যে তোমাকে সুদ্ধ যদি দায়িক করি তা হলে চিত্রগুপ্তের খাতায় আমার বিরুদ্ধে ডবল মার্কা  পড়বে।

অনেক কথা লিখলুম দেখে ভেবো না আমার বাজারে কথার টানাটানি নেই। লেখার অজস্রতা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বয়স কেটেছে  বাক্যে, তার পরে সুরে, এখন দিনান্তে সময় এসেছে মৌনের”।

একবার তাঁর কবিতা নিয়ে সমালোচনার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেন,

“আমার কাব্য ভালো লাগে না এমন লোক বিপুলা পৃথিবীতে দুর্লভ হবে না- কিন্তু আমার কাব্য ও ছন্দের ধারাটা ব্যবহার করছে না এমন কবি বাংলায় আজ নেই একথা বললে অহংকারের মতো শুনতে হবে তবু কথাটা মিথ্যে হবে না।”

রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ জীবনে দেখে গেছেন তাঁর কাব্যসাহিত্য ও কথাসাহিত্য বাংলায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। কিন্তু গানের প্রচার ও জনপ্রিয়তা রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতে প্রত্যক্ষ করেতে পারেননি ব’লেই আক্ষেপ করে লিখেছেন,

“আমার গান সম্বন্ধে ইতিহাসের গতি নির্ণয় করবার সময় পাব না, তোমরা হয়ত কিছু আভাস পেতে পারবে, তখন আমার সময় চলে গেছে, কারণ ভূতকাল থেকে ভূতের কাল পর্যন্ত কোনো সেতু নেই”।

রবীন্দ্র-উত্তরকালে রবীন্দ্রনাথের গান  ক্রমে ক্রমে  বাঙালি বিশেষকরে শিক্ষিত বাঙালির কাছে আজ আভিজাত্য ও অহংকারের বিষয় হিসেবেই দেখা হয়।  যদিও বাংলা ভাষাভাষী সাধারণ মানুষ, যাঁরাই সংখ্যাধিক্য, তাঁদের কাছে রবীন্দ্রনাথের গান  এখনো পৌঁছেনি শিক্ষার আলোর অভাবে। এ দায় রবীন্দ্রনাথের গানের যতটুকু, তারচেয়ে বেশী আমাদের সমাজ ব্যবস্থার – আমাদের রাষ্ট্রের চালকদের। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অনেক গান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ছিল প্রেরণা।

একশ’ কোটি জনসংখ্যার ভারতে প্রায় চোদ্দ কোটি বাংলা ভাষাভাষী। বাকী প্রায় নব্বই কোটি ভারতীয়দের কাছে  রবীন্দ্রনাথের গান ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জনগণমন অধিনায়ক‘-এর মধ্যেই সীমিত। যে কথা রবীন্দ্রনাথ নিজেও আশঙ্কা করেছিলেন ১৯২৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে,

“ It is nonsense to say that music is a universal language. I should like my music to find acceptance, but I know this cannot be, at least not till the West has had time to study and learn to appreciate our music. All the same, I know the artistic value of my songs. They have great beauty. Though they will not be known outside my province, and much of my work will be gradually lost, I leave them a legacy. My own countrymen do not understand. But they will. They are real songs, songs for all seasons and occasions. In my hymns, my Brahmasangit, I have adapted and taken wholesale older tunes from Tansen, the best of our composers; in these, I have used orthodox forms. But for my own songs I have invented very freely”

“সংগীত এক  সার্বজনীন ভাষা একথা বলা অজ্ঞতা। আমার গান গ্রহনযোগত্যা পাবে এ আশা আমার করা উচিত কিন্তু আমি জানি এটা হবার নয়, অন্তত পশ্চিম ( পাশ্চাত্য) যতদিন  না আমার গান জানার ও বোঝার সময় পায়।

সেই সাথে আমি আমার সৃষ্টির মূল্য জানি।  জানি কী এক অপূর্ব সুন্দর এ সৃষ্টিকর্ম। তবু আমার এ সৃষ্টিকর্ম  যদি   বাংলার বাইরে ছড়িয়ে না যায়, তবে অধিকাংশই ক্রমশঃ হারিয়ে যাবে। আমার দেশবাসী আজ এ গানের মূল্য না বুঝলেও একদিন বুঝবে যে, এ গান   এক পরিপূর্ণ সংগীত, এ গান প্রকৃতি ও জীবনের গান । আমার ব্রহ্মসংগীতের সুর  সর্বকালের সেরা ভারতীয় এক মহান সুরকার তানসেনের প্রাচীন উচ্চাংগ সুর থেকে সংগৃহিত, যার মূলটাকে আমি নিয়েছি । কিন্তু আমার গানে সেগুলো স্বতন্ত্র ও নতুনভাবে সৃষ্টি করেছি।“

এ সাক্ষাৎকার থেকে এ কথা বোঝা যায়,  রবীন্দ্রনাথের মনেও দ্বিধা ছিল  বিশ্বের অন্যত্র তো বটেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষের বাইরে ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের গান ভবিষ্যতে কতটুকু জনপ্রিয়তা পাবে।

 

(৪)

“ যে ইচ্ছাপূর্বক গান গাবে এবং যে ইচ্ছাপূর্বক গান শুনবে পৃথিবীতে কেবল এই দুটি মাত্র লোক নেই, চতুর্দিকে অধিকাংশ লোক আছে যারা গান গাবেও না, গান শুনবেও না”।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

রবীন্দ্রনাথের এ কথা থেকে বোঝা যায়, তাঁর  গান যে অধিকাংশ বাঙালি গাবেও না কিংবা শুনবেও না সে বিষয়ে তাঁর সম্যক ধারণা ছিল। তবুও কেনো রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনব্যাপি এতো গান লিখেছেন? তাঁর অন্যান্য সৃষ্টিকর্মের মধ্যে গানই শুধু বেঁচে থাকবে এ উচ্চাশাও কেনো তিনি রাখতেন? তাহ’লে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি বিশেষকরে গান তবে কী সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণীর জন্য রচিত?

তবে কী সাহিত্য-সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার চেয়েও সংগীত এমন একটি বিশেষায়িত শাখা যেখানে শ্রোতাকেও শিক্ষিত হ’তে হয়? রবীন্দ্রনাথের গানের ক্ষেত্রে তো বটেই।

রবীন্দ্রনাথ নিজেও বলেছেন, তিনি বাংলা সংগীতকে সুরের বিস্তৃতি থেকে বের করে এনে  সেখানে বাণী বা ভাবের বিস্তার ঘটিয়েছেন। কিন্তু সে ভাবের বিস্তৃতি শুধুই কী অগভীর কিছু শব্দাল্কারের অসমাবেশ? সংগীতে ভাবের খেলা সেতো কীর্তন, পদাবলী , এমনকী কবিগানেও ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান সে শান বাঁধানো পোস্তা করা ঘাটে জলকেলি করেনি বরং সে পদ্মদিঘি পার হয়েছে নিপুন সাঁতারে।

বৈষ্ণব কবিদের পদাবলী ভাব ভাষা ছন্দ রাগিনী সবকিছুরই অপূর্ব সমাহার আছ, আছে সৌন্দর্য এবং নৈপুণ্যও।  গায়কেরা এক সময় রাজার সভায় সংগীত পরিবেশন করতেন। কিন্তু গায়কেরা যখন রাজসভার বাইরের নতুন গজিয়ে ওঠা ধনিক ও বণিক সম্প্রদায়ের দিনের ক্লান্তি ঘুচাতে সন্ধ্যাবেলার বৈঠকে গান পরিবেশন করতে শুরু করলেন, বিপত্তি ঘটলো সেখানেই।

শ্রোতাদের আমোদিত করতে – উত্তেজিত করতে কবিয়াল গায়কেরা কথার কৌশলে, অনুপ্রাসের ছটায় অপ্রয়োজনীয় অলঙ্কারের আঘাতে ভাবের অপকর্ষই সাধিত হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,

“সংগীত যখন বর্বর  অবস্থায় থাকে তখন তাহাতে রাগরাগিনীর যতই অভাব থাক, তালপ্রয়োগের খচমচ কোলাহল যথেষ্ট থাকে।  সুরের অপেক্ষা সেই ঘন ঘন সশব্দ আঘাতে অশিক্ষিত চিত্ত সহজে মাতিয়া উঠে”।

১৮৯৪ সালে লেখা (কবিসংগীত)  রবীন্দ্রনাথের এ আশঙ্কাই  সত্যি হয়েছে আজকে।  প্রতিনিয়ত তাঁর গানকে সুরের নামে এরকম  ‘সশব্দ আঘাত‘-কে অতিক্রম করতে হয়েছে;  ‘অশিক্ষিত চিত্তের সহজে মাতিয়া উঠা‘-কে  দু’হাতে ঠেলে পাশে সরিয়ে রেখে বাঙালির মন ও মননকে শিক্ষিত করে তবেই তাদের ড্রইং রুমে স্থান করে নিতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গানকে ।

রবীন্দ্রনাথ  প্রায় ১২৫ বছর আগে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে,

“অচিরকালেই সাধারণের এমন উন্নতি হইবে যে, তাহার অবসরবিনোদনের মধেও ভদ্রোচিত সংযম, গভীরতর সত্য এবং দুরূহতর আদর্শের প্রতিষ্ঠা দেখিতে পাইবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই”।

আসলেই  কী রবীন্দ্রনাথের গানের শিল্পী ও শ্রোতারা রবীন্দ্রনাথ-বর্ণিত ‘ভদ্রোচিত সংযম, গভীরতর সত্য এবং দুরূহতর আদর্শের প্রতিষ্ঠা‘ লাভ করেছেন?

এ প্রশ্নের উত্তর ও উপায়ের মধ্যেই বোধহয় নিহিত আছে রবীন্দ্রনাথের গানের জনপ্রিয়তা কিংবা অ-জনপ্রিয় হ’বার কারণ।

 

 

পরিশিষ্ট:

১. আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে – সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়: 

২. তার বিদায়বেলার মালাখানি  – চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়: 

৩. আমি কান পেতে রই – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়:

৪. যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে – দেবব্রত বিশ্বাস:

৫. আকাশ ভরা সূর্য তারা – দেবব্রত বিশ্বাস:

৬. কেন চেয়ে আছ গো মা – ঋত্বিক ঘটক:

৭.  বিধির বাঁধন কাটবে তুমি – কিশোর কুমার:

৮. এ পরবাসে রবে কে –

৯.  ছায়া ঘনাইছে বনে বনে – দেবব্রত বিশ্বাস:

১০.  The Positive Encourager: T is for Rabindranath Tagore’s Work

 

চলবে…

ভজন সরকার এর ব্লগ   ৫৬৬ বার পঠিত