আবুল কাশেম

অনুবাদক: আবুল কাশেম

[অনুবাদকের ভুমিকা: প্রিয় তিন বছর আগে সৌদি আরবের এক পাঠক আমাকে একটি ই-মেইল লেখেন। এটা আমার জন্য ছিল নিতান্তই অপ্রত্যাশিত ও গুরত্বপূর্ণ। আমরা যারা ইসলামের সমালোচনা করি তারা চিন্তাই করতে পারিনা যে ইসলামের জন্মভূমি সৌদি আরবে কিছু লোকজন আছে যারা ইসলাম ত্যাগ করতে একপায়ে দাঁড়া, যদিও তাদের সংখ্যা নিতান্তই নগন্ন। আমার সাথে খালেদের প্রচুর ই-মেইল আদান প্রদান হয়েছে—যদিও আজ আমার সাথে তেমন যোগাযোগ নেই। আমি খালেদের একটি ই-মেইল বাংলায় অনুবাদ করলাম। ভবিষ্যতে ইচ্ছা থাকল খালেদের আরো কিছু খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখা বাঙলায় অনুবাদ করে ব্লগে প্রকাশ করবো। এখানে উল্লেখযোগ্য যে খালেদের ঐ লেখাগুলি একটা বইতে প্রকাশ হয়েছে। বইটার টাইটেল হলো: Why We Left Islam.

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ: এই বাংলা লেখা এবং বাংলা টাইপ আমার হাতেখড়ি। ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে দিবেন।

ডিসেম্বর ১৩, ২০০৯]

—-

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন প্রতিদিন মসজিদে যেতাম। সেখানে আমি ইসলামি প্রার্থনা শিক্ষা ছাড়াও কোরান আবৃত্তি, হাদিস এবং তফসির শিখতাম।

আমাদের মসজিদের শিক্ষক এবং অন্যান্য ইসলামি পন্ডিতেরা আমাদের বলতেন যে, যেহেতু আমরা মুসলমান সেইহেতু আমরা হচ্ছি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। ওনারা আরো বলতেন যে সৌদি আরবের মুসলমানেরা হচ্ছে একমাত্র প্রকৃত মুসলিম। সেই জন্য বিশ্বের তাবত মুসলিমরা এক মাত্র সৌদি মুসলিমদের অনুসরণ করবে, অন্য কাউকে নয়। বলা বাহুল্য আমরা একবাক্যে, কোন প্রশ্ন ছাড়াই, দৃঢ় ভাবে ঐ সব মেনে নিতাম। কিন্তু আমরা একটুকু আশ্চর্য হতাম যে এত বাগাড়ম্বর সত্যেও বিশ্বের কেউ আমাদেরকে তাদের সমকক্ষ মনে করেনা।

এই ভাবে আমরা নিজেরা মুসলমান হিসাবে খুবই গর্ব বোধ কোরতাম।

কিন্তু এখন আমি মনে করি এসব ছিল একেবারেই মিথ্যা।

পাঠকবৃন্দ, আমি হলফ্‌ সহ বলতে পারি যে আমি সৌদি আরবের মসজিদে যা পড়েছি এবং শিখেছি ওসামা বিন লাদেন হুবহু তাই পালন করে। এতে কারো মনে কোন সন্দেহ থাকা উচিত নয়। আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি সে একেবারে পাক্কা মুসলমান। আনুগ্রহপূর্বক আপনারা বিশ্বাস করুন যে সৌদি আরবের প্রায় সবাই বিন লাদেনের সমর্থক এবং তাকে দারুন ভাবে তাকে ভালবাসে তার কার্য্য কলাপের জন্য।

বিন লাদেনের ক্রিয়া কলাপের জন্য আমরা কি তাকে দোষী করতে পারি? কক্ষনো নয়। তার পরিবর্তে আমাদের ইঙ্গিত করতে হবে ইলামের প্রতি। বিন লাদেন তো অক্ষরে অক্ষরে ইসলাম পালন করছে। সে নিঃসন্দেহে ইসলামের নির্ভিক সেনানি, একে বারে খাঁটি মুসলমান।

এখন আমার কথায় আসা যাক। আমার ইসলাম ছাড়ার ঘটনা শুরু হয় আমি যখন পঞ্চম গ্রেডের ছাত্র।আমি কোরানের সুরা আল-কাহফ্‌ আয়াত ৮৬ (১৮:৮৬) পড়লাম। এখানে লেখা আছে যখন জুলকারনাইন সুর্যাস্তের প্রান্তে পৌছাল তখন সে দেখল অনেক লোক সুর্যের প্রচন্ড তাপে অসহনীয় ভাবে পীড়িত। এর কারন হল সুর্য‌্টা তখন ঐ লোকদের খুব কাছাকাছি ছিল। ঐ একই ঘটনা ঘটল যখন সে সুর্য্যদয়ের প্রান্তে পৌছাল।

আমি ভাবলাম: এটা কি ভাবে সম্ভব! পৃথিবী তো একটা বলের মত গোলাকার। তা হলে জুলকারনাইন কেমন ভাবে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌছাল? আমি আমার শিক্ষককে এ বিষয়ে জিজ্জাসা করলাম। আমার শিক্ষক একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। তিনি কোন উত্তর দিতে পারলেননা, শুধু বললেন কোরানে যা লেখা আছে তাতেই বিশ্বাস করতে হবে-কোন প্রশ্ন করা চলবেনা।

এই ভাবে কোরানের প্রতি আমার সংশয় শুরু হয়।

এরপর একটা বিশাল বিস্ময় আমার মনকে পীড়িত করলো। আমি জানলাম যে আমি যদি ভাল মুসলিম হতে চাই তবে আমাকে অবশ্যয় অমুসলিমদের থেকে দূরে থাকতে হবে। আরো বিস্মিত হলাম এই জেনে যে আমি যদি আমুসলিমদের সাথে বন্ধুত্ব করি তা হলে আমি কাফের হয়ে যাব।

আমি অন্যান্য ক্রিয়াকলাপের মত চলচ্চিত্র দেখা,গান শোনা এবং খেলাধুলায় পারদর্শিদের সাথে বন্ধুত্ব করা খুবই পছন্দ করতাম। এদের বেশির ভাগই ছিল অমুসলিম। এখন ইসলামের নীতি আনুযায়ী আমি সত্যিই কাফের হয়ে গেছি। আমি শিখেছি যে স্বর্গে যেতে হলে নবী মোহাম্মদকে শর্তহীন ভাবে ভালবাসতে হবে, যদিও আমি কোনদিনই তাঁকে দেখি নাই। এখন আমি সম্পুর্ন নিশ্চিত হলাম যে আমার স্থান নরকে।

আমি ইমামদের কথাবার্তা শুনে আরো বিক্ষুদ্ব হলাম। তারা অত্যান্ত গালিগালাজপূর্ণ ভাষায় অমুসলিমদের বানর এবং শুকরের নাতি-নাতনি বলে আখ্যায়িত করলো। আমি চিন্তা করলাম যদি কেউ পাপ করে তার শাস্তি আল্লাহ্‌ দিবেন। আমাদের ইমামরা কেনই বা ওদের আপমানজনক ভাবে নিন্দা এবং বিদ্রুপ করবে?

আমি আরো বিস্মিত হলাম যখন আমার মুসলিম বন্ধুরা এবং আমার নিজের ইমাম বললো যেহেতু অমুসলিমরা মুসলিমদের শত্রু সেহেতু আমাদের কর্ত্তব্য হবে সর্ব ভাবে অমুসলিমদের হেয় প্রতিপন্ন করা এবং তীব্র ভাষায় কটুক্তি করা। আমি তাদের কথায় রাজী না হওয়ায় তারা আমাকে দুর্বল মুসলিম আখ্যায়িত কোরল। তারা আমাকে এটাও বললো যে একজন বিদেশী না জানা মুসলিম একজন অতি পুরাতন বিশ্বস্ত কাফের বন্ধুর চাইতে অনেক ভালো

আমি কিন্তু আমার প্রশ্ন থেকে বিরত থাকলামনা। সবচাইতে উল্লেখযোগ্য যে প্রশ্ন আমার মনে সর্বদা বিরাজমান ছিল সেটা হলো: এ কেমন আল্লাহ্‌ যিনি নিজেকে সবসমই পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল হিসেবে দাবি করেন অথচ তিনি কেমন ভাবে তাঁর প্রিয় বান্দাদের একে অপরের প্রতি ঘৃনা প্রকাশ করতে বলেন? কিঞ্চিত অবিশ্বাস করলে আল্লাহ্‌ কেন আগুনে পোড়ানোর এবং অসীম নির্যাতনের ভীতি প্রদর্শন করেন তাঁরই সৃষ্ট মানবকুলের প্রতি? আল্লাহ্‌ কি আমাদের উপাসনার জন্য এতই কাঙ্গাল? আমরা সর্বদা তাঁর উপাসনা করি এটা কি তাঁর জন্য সত্যিই এত গুরুত্বপূর্ণ?

এই সব প্রশ্ন নিয়ে আমি গভীর চিন্তা করলাম। আমি কোরান ঘেঁটে ঘেঁটে দেখলাম যে আমাদের নিয়তি আল্লাহ্‌ আগেই নির্ধারিত করে দিয়েছেন। কে স্বর্গে যাবে, কে নরকে যাবে সেতো আল্লাহ্‌ বহু পুর্বেই ঠিক করেছেন। যুক্তিযুক্ত কারনে তাই বলা যায় যে প্রার্থনা করে কিইবা হবে? আমি যখন এই প্রশ্ন ধর্মপ্রান মুসল্লীদের করলাম তখন ওরা আমার প্রতি ভীষন ক্রদ্ব হয়ে গেল। ওরা আমাকে জিজ্ঞাসা করল আমি পুর্বথেকে কেমন করে জানি আমার স্থান কোথায়—স্বর্গে না নরকে? আমি উত্তর দিলাম যেহেতু আল্লাহ্‌ আমাদের সবার পরিনতি আগেই ঠিক করে দিয়েছেন কাজেই নামাজ পড়া আর না পড়া কোন পার্থক্য আনবেনা। ওরা আমাকে বিকৃতমস্তিষ্ক ঠিক করল, কারণ আমি আল্লাহ্‌র ব্যাপারে সন্দেহ করেছি।

এই ভাবেই ইসলামের প্রতি আমার ঘৃণার শুরু। কিন্তু সৌদি আরবে আমি হলাম অসহায়। আমি যে সমাজে বাস করি সেখানে খোলাখুলি ভাবে বে-ইসলামি কিছু করা যাবেনা

১৯৯৯ সালে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন, এবং কিছুদিন পরে মারা যান। এই ঘটনা আমার জীবনের মোড় পরিবর্তন করে দেয়। আমি চিন্তা করে বুঝলাম আমরা মুসলিমরা কোন ক্রমেই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি নই। অন্যান্যদের মতো আমরাও পীড়িত হই এবং সময়ের সাথে আমরাও মারা যাই। আমি এটাও বুঝলাম যে পরিশ্রমী হলে আমরাও উন্নতির পথে অগ্রসর হতে পারি। আর তা যদি না করি তবে আমাদের পশ্চাদপদতা একেবারে সুনিশ্চিত। ‘আল্লাহ্‌র ইচ্ছা’ বলতে কিছুই নাই। মুসলিমদের বিশেষ স্থানের দাবি নিতান্তই হাস্যকর।

আজ আমি যখন ইসলামি বিশ্বের প্রতি তাকাই শুধুই দেখি চরম অন্যায়, অবিচার এবং নারী ও কাফেরদের প্রতি অসীম বৈষম্যমূলক আচরন আর নগ্ন ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন। ইসলামি জগতে সীমাহীন অরাজকাতা ও দূর্নীতির কথা নাই বা বললাম। আমরা পরিষ্কার দেখি যে ইসলামি বিশ্ব এক গভীর সমস্যায় নিমজ্জিত।

আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি: “ইসলামি বিশ্বের এই অসীম দূর্গতির কারন কি?” আমি আবার নিজেই বিশ্বাসযোগ্য উত্তর পাই—সেটা হল ইসলাম। আমি এখন সন্দেহাতীত যে ইসলাম হচ্ছে একটা অর্থহীন, মূঢ় এবং ভূল ধর্ম।

দুঃখের বিষয় হলো: ইসলামের প্রতি আমার ঘৃনা বৃদ্ধি সত্তেও আমি ইসলাম কে আমার জীবন হতে বিতাড়িত করতে পারি নাই। মনের গভিরে আমি চিন্তা করতাম যে ইসলাম এত খারাব হতে পারেনা—হয়তবা সমস্যা টা মুসলিমদের জন্য—ইসলামের জন্য নয়।

কিন্তু ৯/১১-এ আমি যা দেখলাম সেতো ইসলামের প্রকৃত রূপ। আমি বিস্মিত হয়ে আমাদের লোকদের মুখে দেখলাম সহাস্যতা এবং সুখের ছায়া। তার কারন হলো এত সহজেই অগুনতি কাফের মেরে ফেলা যায় সেটা চিন্তাই করা যায় না। আমি অসীম বেদনার সাথে লক্ষ্য করলাম আমার লোকদের উল্লাস—যেহেতু এত বেশী নিরীহ কাফের মারা গেছে। আমি দেখলাম প্রচুর মুসলিম আল্লাহ্‌কে শুকরিয়া জানালো এই নির্দয় হত্যাকান্ডের জন্য। এই সব ইসলামি জনগন ভাবে যে আল্লাহ্‌ মুসলিমদের কামনা বাসনা পরিপূর্ন করেছেন। এই ভাবেই বুঝি শুরু হল জগত জুড়ে কাফের ধ্বংসের খেলা।

আমার নিকট এ সব ছিল নিতান্তই অমানবিক আচরন।

এর কিছুদিন পর আমাদের ইমাম আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করলেন তালিবানদের বিজয়ের জন্য—মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে। তখন আমি নিতান্তই ক্রুদ্ধ হয়ে নামাজ পড়া ছেড়ে দিলাম।

২০০৪ সালে আমার পাকিস্তানি ম্যানেজারের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হয়। আমার বিশ্বাস উনি বেশ ইসলাম বিরুদ্ধ ছিলেন। উনার সংস্পর্শে আসার ফলে আমার মানবচেতনা ফিরে আসে। উনি আমাকে আশ্বাস দেন যে আমি বিকৃতমস্তিষ্ক নই। এর পর আমি মসজিদে যাওয়া বন্ধ করে দিলাম, এবং রমজান মাসের রোজা রাখা হতে বিরত থাকলাম। গত বছর আমি একটি রোজাও রাখি নাই।

আমার জীবন হতে ইসলাম মুছে দেয়ার পর আমি না এখন কতই মুক্ত এবং সুখী বোধ করছি। নিজেকে আর আমি দোষী বা অপরাধী ভাবি না। আমি এখন কোন চিন্তা ছাড়া চলচ্চিত্র উপভোগ করতে পারি—গানও শুনতে পারি। আমার মনে হয় আমার যেন নতুন জন্ম হয়েছে—আমি এখন সর্বভাবে মুক্ত ও আমার যা ভাল লাগে তাই-ই করতে পারি।

আমি আশা রাখি ভবিষ্যতে আমি ভয়ংকর ইসলাম সম্বন্ধে অনেক কিছু লিখব।

আপানাদের ওয়েব সাইটকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি—এর কারনেই আমি আজ আর একাকি বোধ করিনা। এখন আমি সম্পুর্ন ভাবে নিশ্চিত আমি ভুল করি নাই।

ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছান্তে।

খালেদ

সৌদি আরব

জানুয়ারী ১৩, ২০০৬

 

0 Shares

আবুল কাশেম এর ব্লগ   ৬৫ বার পঠিত