মনজুরুল হক

চার্লস ডারউইন এবং হেনরি ল্যুইস মরগান যাকে ‘ন্যাচারাল সিলেকশন‘ বলছেন তার সরল বাংলা ভাবার্থ করা দুষ্কর। মোটামুটি যতটুকু বোঝা যায়, প্রকৃতির বৈশিষ্ট বা গুণাবলি প্রকৃতিগতভাবেই এক সময় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। মানুষের জিনে সেটাই এক সময় সাধারণ নিয়ম বা অভ্যেসে রূপান্তর ঘটায়, আর তাকেই আমরা ‘জেনেটিক‘ বলে বোঝাতে চাই।

আপনি যখন ছোটবেলায় পড়া প্রবচন-‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ নিয়ে ভাববেন তখন নির্মোহভাবে প্রথমেই ধরে নিতে হবে এটাতে স্বার্থপরতা শেখানো হচ্ছে। আপনি যখন টোনা-টুনির গল্প নিয়ে ভাববেন তখন বুঝতে অসুবিধে হবে না গল্পটিতে নির্ভেজাল ফাঁকিবাজী শেখানো হচ্ছে (সবাইকে পিঠা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে টোনা বলল- এত জনকে কিভাবে খাওয়াবে? টুনি তখন পিঠা বানিয়ে নিজেরা খেয়ে চম্পট দিল। ‘বুদ্ধি’ করে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের টাকা বেঁচে গেল)! সেভাবেই ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’ শুনলেই বোঝা যায় বাপেরও আগে নিজেকে বাঁচাতে হবে! পিছিয়ে থাকা সামন্ত বা আধা বর্বর সমাজে এরকম আরও অনেক হেতু আছে যাতে সেলফিস হওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়। ভাববাদী এবং ধর্মীয় এমন কোনো শিক্ষা নেই যা পরপোকারী হতে শেখায়। অন্তত ছোটদের পাঠ্য পুস্তকে নেই। আমাদের সময়েই ছিলনা, এখন তো নেই-ই।

তাই আসমান থেকে এমন কোনো বাণী ঝরে পড়বে না যা দেখে আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা সেলফিস হওয়ার বদলে পরপোকারী, সমবেত মঙ্গলাকাঙ্খী হতে শিখি।

এতগুলো নিরস কাটকোট্ঠা কথা বলা হল আমাদের ভেতরকার বৈশিষ্ট বা জিন এর প্রভাব বিষয়ে বলার জন্য।

সামান্য কিছু পরিবারে পারিবারিকভাবে কিছু পরিমানে সামগ্রিক শিক্ষাটা দেয়া হয় বটে, তবে তা মাইক্রোস্কোপিক। মোটা দাগে আমরা প্রায় সকলেই সেলফিস বা আত্মকেন্দ্রিক কিংবা বিশ্বাসঘাতক। আমাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়ে কোনো মিথ নেই। আমাদের জনপদের বৈশিষ্ট নিয়ে কোনো চরিত্রগঠনমূলক গল্প নেই। আমাদের জেনেটিক বৈশিষ্টের মধ্যে কোনো আত্মত্যাগের মহিমা নেই। এক একাত্তর? সেই ত্যাগ সামগ্রিক। রাষ্ট্রের উপর চেপে বসা পাথর সরাতে। চূড়ান্ত বিচারে সারভাইভ করতে।

২৮ জুলাই তারিখটা কয়েকটি অদ্ভুত কারণে স্মরণযোগ্য! বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্ন উঠলেই আমরা মীর জাফর আলীর নাম স্মরণ করি। অথচ তিনি যেমন বাঙালি ছিলেন না, তেমনি সিরাজও বাঙালি ছিলেন না। বরং বিশ্বাসঘাতকের বিপরীতে আমরা মদনলালকে পাই বিশ্বাস রক্ষাকারীর বদলে আজ্ঞাবহ ‘ভৃত্য’রূপে!

চারু মজুমদার

এই ২৮ জুলাই ভারতবর্ষের বিপ্লবের অথরিটি কমরেড চারু মজুমদারের শহীদ দিবস। তাকে ধরিয়ে দিয়েছিল তারই পার্টির দুজন। মারাত্মক দরকারী ওষুধ বন্ধ করে মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছিল এসআই রুনি নিয়োগী। অত্যাচার করেছিল দরিদ্র বাঙালি ঘরের পুলিশ কনস্টেবল।

টুটু

এই ২৮ জুলাইতেই হত্যা করা হয়েছিল পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা) সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান টুটুকে। মনে করা হয় তাকেও ধরিয়ে দিয়েছিল তারই পার্টির কেউ একজন বা একাধিকজন!

মোফাখখার

তারও আগে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক মোফাখখার চৌধুরীকে হত্যা করেছিল র‌্যাব।

আরও আগে রক্ষীবাহিনী, পুলিশ, যৌথ বাহিনী, র‌্যাব যাদের হত্যা করেছে সেই সব নাম এখানে সংকুলান হবে না। তাদের সবারই মৃত্যুর পেছনে কোনো না কোনোভাবে ‘ধরিয়ে দেয়া’, ‘দেখিয়ে দেয়া’,’ বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ রয়েছে।

সিরাজ সিকদার

দেখা যাবে খুব সামান্য কোনো স্বার্থের কারণে একজন সিরাজ শিকদার কিংবা মনিরুজ্জামান তারা, বাদল দত্ত অথবা ডা. টুটুদের ধরিয়ে দিয়েছে কেউ। হতে পারে মাত্র কয়েকশ টাকার জন্য কেউ এটা করেছে! হতে পারে ‘একদিন ধমকেছিলে’ সেই রাগে! হতে পারে মতাদর্শের দ্বি-মতে।

১৭৬৪ সালে কুমিল্লা, ত্রিপুরা অঞ্চলের মহাবিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়া শমসের গাজীকে কুকি বাহিনী কামানের গোলার মুখে উড়িয়ে দিয়েছিল। ফকির মজনু শাহকেও হত্যা করা হয়েছিল মহাবিদ্রোহে ফকির-সন্যাসীদের নেতৃত্ব দেয়ার কারণে। এদের সকলকেই ধরিয়ে দিয়েছিল ‘জাত ভাই’। ব্রিটিশরা অনেক কিছুর মত সেই ‘বিশ্বাসঘাতক কেনা’ বা ‘চর পোষা’ বিদ্যেটাও রেখে গেছে!

বিশ্বাসঘাতকতা, সমষ্টির চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থকে বড় করে দেখা, সবকিছু নিজের করে পেতে চাওয়া, আমি আর আমি এবং শেষ পর্যন্ত আমিই….সংস্কৃতিটাও এই জনপদের অন্যতম বৈশিষ্ট।

..

কমরেড চারু মজুমদার, ডা.টুটু, মোফাখখার চৌধুরী, সরোজ দত্ত, দীলিপ বাগচি, দীপঙ্করদের মত অজস্র আত্মত্যাগকারী নামের পাশে ছোট্ট করে হয়ত রয়ে গেছে কোনো বিশ্বাসঘাতকের নামও। সব ইতিহাস হয়ত কোনোদিনও জানা যাবে না।

মনজুরুল হক এর ব্লগ   ১০২ বার পঠিত