নাজিম উদ্দিন

সময় কী ? আমাদের সবার সময়ের ধারনা আছে,  সময়ের বৈশিষ্ট্যসূচক ঘটনাবলীকে আমরা বুঝতে পারি, এমনকী আমরা ভিন্ন ভিন্ন সময়ের মধ্যে পার্থক্যও করতে পারতে পারি।  কিন্তু সময় কী জিনিস এটা আমরা সম্পূর্ণ সঠিকভাবে বলতে পারি না। সময় এত দ্রুত পালায় যে ‘বর্তমান’ সময়ে আমাদের দাঁড়ানোর কোন সুযোগ নেই, বর্তমানকে ধরতে না ধরতেই সে অতীত হয়ে যায়।  আবার আমাদের অভিজ্ঞতায়, সময় কখনও খুবই ধীর, অপেক্ষার সময় যেমন সহজে কাটতে চায় না। আবার কখনও খুবই দ্রুতগতির, যেমন আনন্দের সময় খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। সময় এবং সময়ের চেতনা যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটা সহজ নয়।  সাধু অগাস্টিনের ভাষায়,

“What is time then? If nobody asks me, I know; but if I wish to explain it plainly I know not.”

– St. Augustine

সময় বিশ্বজনীন একটা ধারনা, শুন্য, বস্তু এবং রূপের (space, matter, form) ধারনার মত জগতকে বুঝার জন্য সময়  আমাদের অন্যতম হাতিয়ার। জগত থেকে আমরা একে আলাদা করতে পারি না। দুনিয়াতে এসেই আমরা সময় সচেতন হই, আমাদের বোধ-বুদ্ধির সাথে সময়ের ধারনা জড়িত। আমাদের মনে সময় একটা সরলরেখার মত, অতীতে শুরু হয়ে বর্তমান পেরিয়ে ভবিষ্যতের দিকে ছুটে যাচ্ছে।

আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা আমাদের জীবন থেকে প্রাকৃতিক ছন্দময় চক্রকে সরিয়ে হাতে ঘড়ি পরিয়ে ছেড়েছে। এখন আমাদের জীবন ঘড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে আবর্তিত হয়। আমাদের প্রগ্রেস বা উন্নয়নের ধারণাও এ ঘড়ির সাথে সম্পর্কিত। মনে হচ্ছে আমরা যেন কোথাও যাচ্ছি, অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে ক্রমাগত ছুটে চলছি। সময় আমাদের জীবনকে এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে আমাদের ঘড়ির কাঁটা ধরে চলতে হয়। একটু এদিক থেকে ওদিক হলে চরম অনিষ্ট ঘটে যেতে পারে।

অথচ দুনিয়াতে সবসময় সময়ের এমন সরলরৈখিক ধারনা ছিল না। মানুষ প্রাকৃতিক চক্রের সাথে নিজের জীবনকে মিলিয়ে নিত। দুনিয়ার প্রায় প্রত্যেক সমাজে প্রাকৃতিক বিভিন্ন চক্রকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। দিন-রাতের চক্র, ঋতু চক্রের সাথে মানুষের জীবন আবর্তিত হত, এর বাইরে সময়ের ধারণার প্রয়োজন ছিল না। এখনও দুনিয়াতে অনেক আদিবাসী আছে যাদের আমাদের মত সরলরৈখিক সময়ের ধারনা নেই, যাদের জীবন আজো প্রাকৃতিক চক্রের সাথে আবর্তিত হয়।

বর্তমান বিজ্ঞানে ধারনা করা হয় বিগ ব্যাং এর কারনে বিশ্বজগতের সৃষ্টি হয়ে আমরা একটা ক্রম সম্প্রসারিত বিশ্বে আছি। বিগ ব্যাং থেকে সময় শুরু হয়ে আজকে প্রায় ১৪ বিলিয়ন বছর পার হয়ে গেছে, আমরা ক্রমাগত সময় পার করে ‘সামনের দিকে’ যাচ্ছি।  কিন্তু বিগ ব্যাং এর আগে কী ছিল? এমন কী হতে পারে বিগ ব্যাং নিজেই আরেকটা চক্রের সমাপ্তি?  অন্য কোন ধর্ম বা সংস্কৃতিতে এমন কোন ধারনা না থাকলেও হিন্দু ধর্মে কিন্তু সেরকম একটা ধারনা চালু আছে।  সনাতন ধর্মের চিন্তকেরা সব কিছুকেই চক্রাকারে দেখেন, সমগ্র বিশ্বজগতও এ চক্রের বাইরে নয়।  সৃষ্টির সাথে ধ্বংস জড়িত, বিগ ব্যাং কে আমরা যদি বর্তমান বিশ্বের সৃষ্টি মনে করি তাহলে একইসাথে সেটা এর আগের বিশ্বের ধ্বংস।  সৃষ্টি এবং ধ্বংসের দেবতা শিব এ কাজের তত্ত্বাবধান করেন। তারপরে ব্রক্ষ্মা এ সৃষ্টিতে কাঠামো দান করেন এবং বিষ্ণু এ সৃষ্টির রক্ষণা-বেক্ষণ করেন। এভাবে একসময় আবার এ জগতের সময় শেষ হয়ে আসলে শিব এ জগত ধ্বংস করে নতুন জগত সৃষ্টি করে।

ব্রক্ষ্মার স্বপ্নে জগত

 

“The Hindu religion is the only one of the world’s great faiths dedicated to the idea that the Cosmos itself undergoes an immense, indeed an infinite, number of deaths and rebirths. It is the only religion in which the time scales correspond, no doubt by accident, to those of modern scientific cosmology. ”

– Carl Sagan

মানুষের জীবনে যেরকম দিন-রাতের চক্র আছে তেমনি ব্রক্ষ্মার জীবনেও দিন-রাত আছে। আমাদের চক্র ২৪ ঘন্টায় শেষ হয়, অপরদিকে ব্রক্ষ্মার চক্র ৮.৬৪ বিলিয়ন বছর, সৌরজগতের সূর্য এবং পৃথিবীর চেয়ে বেশি কিন্তু বিগ ব্যাং শুরু হবার প্রায় অর্ধেক সময় পর।

পুরো বিশ্বজগত দেবতার স্বপ্ন, ১০০ ব্রক্ষ্ম বছর স্বপ্ন দেখার পরে দেবতা স্বপ্নবিহীন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলে দুনিয়ার বিলুপ্তি ঘটে। আরো একশ বছর ঘুমিয়ে কাটানো পর দেবতা একসময় জেগে ওঠে আবার স্বপ্ন দেখা শুরু করলে আবার জগত শুরু হয়। এ সময় অন্যত্র আরো অসংখ্য জগতের আবির্ভাব হয় এবং এরকম সব জগতেরই একজন দেবতা থাকেন, জগতটা তার স্বপ্ন। আরো বিস্ময়কর কথা হল, তারা মনে করত মানুষ দেবতাদের স্বপ্ন নাও হতে পারে কিন্তু দেবতারা মানুষের স্বপ্ন এটা বলা যায়।

 “ It is said that men may not be the dreams of the gods, but rather that the gods are the dreams of men.”

আমাদের বিশ্বজগতে যদি একটা ক্রিটিক্যাল পরিমান বস্তু না থাকে তাহলে মহাবিশ্ব অসীম সময় পর্যন্ত প্রসারিত হতে থাকবে। আরেকটা হতে পারে বিশ্বজগত হয়ত এক সময় স্লো ডাউন করবে, সম্প্রসারণ থামবে এমন কী সংকুচিত হতে শুরু করবে। বিশ্বজগতে যদি আমাদের জানার চেয়ে বেশি ম্যাটার থাকে তাহলে মহাকর্ষ একে ধরে রাখবে এবং সম্প্রসারণের পরে সংকোচন ঘটবে, এবং ভারতীয় ধারনামত এ চক্র চলতে থাকবে, ‘Cosmos without end’। যদি সেরকম হয় তাহলে,

“The Big Bang is not the creation of the Cosmos but merely the end of the previous cycle, the destruction of the last incarnation of the Cosmos.”

– Carl Sagan

দিন-রাত, মাস, ঋতু, বছরের এ চক্রে আমাদের আধুনিক সময়ের ধারনা নেই, সময়ের কোন গাছ-পাথর নেই। সময়ের ধারণাটা মানুষের আবিষ্কার, সময় আমাদের স্মৃতি, আমাদের শারীরিক বয়স এবং পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত। তা না হলে একের পর এক প্রাকৃতিক চক্র আসছে আর আমরা তার সাথে মিলে-মিশে আছি। শারীরিক পরিবর্তন, চামড়া কুঁচকে যাওয়া ছাড়া এর মধ্যে সামনে বা পেছনে আগানোর কোন ব্যাপার নেই। সময় হিসেবেও অতীত এবং ভবিষ্যত বলে কোন কিছু নেই।

 

বর্তমান সময়টাই বাস্তব

 

অতীত হলো আমাদের স্মৃতি, এর বাইরে কোথাও অতীতের অস্তিত্ব নেই। ভবিষ্যতও তেমনি আমাদের কল্পনায়, আশা-ভরসায়, ভয়-ভীতিতে আছে, তার বাইরে ভবিষ্যত বলে কিছু নাই। একমাত্র যেটা আছে সেটা হলো ‘বর্তমান’, ‘এখন’। তেমনি মাস বা বছর নয়, মানুষ আসলে বেঁচে থাকে একদিন মাত্র, প্রতিদিন সকালে তার জন্ম হয়, রাতের গভীর স্বপ্নবিহীন ঘুম বা সুষুপ্তিতে তার মৃত্যু হয়।

বর্তমান সবসময় খুবই কষ্টদায়ক, সেজন্য আমরা সেটা ভুলে থাকার চেষ্টা করি। বর্তমানকে আমরা ভবিষ্যতের সুখ কল্পনা দিয়ে ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করি, ভবিষ্যতই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। যার কারনে আমরা কখনও বাঁচি না, কেবল অনাগত ভবিষ্যতে  বাঁচার আশা নিয়ে  থাকি। ‘দেখিস একদিন আমরাও’। আমাদের নিজেদের চিন্তা-ধারা অনুসরণ করলে এটা স্পষ্ট দেখা যাবে আমরা প্রায় সব সময় অতীত বা ভবিষ্যতের চিন্তা নিয়েই ব্যস্ত থাকি, এবং যে সময়টা আমাদের নিজস্ব, যখন কিছু করা সম্ভব সেটাকে হেলায় নষ্ট করি। কিন্তু  জ্ঞানী, মহত লোক তার অতীত স্ৃতি এবং ভবিষ্যতের আশা নিয়ে বর্তমানে বাস করেন। কেউ আমাদের কাছ থেকে অতীত ছিনিয়ে নিতে পারবে না, প্রয়োজন হলে বা  চাইলেই যে কোন সময় স্মৃতির কানাগলিতে হারিয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু সেখানে বাস করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আর ভবিষ্যত কেউ বলতে পারে না, ভবিষ্যত অনিশ্চিত, বর্তমানের কাজ আর অতীত সেটা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে। তাই শুধু আশা নিয়ে থাকাটাও বোকামি। অতীত আর ভবিষ্যতের সম্ভাবনা সাথে করে বর্তমানে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। অনেক কঠিন কাজ, কিন্তু মনে হয় অসম্ভব নয়।

“Those who live mainly in hope, and those who live mainly in recollection, both exhibit an incorrect relation to time. The sound individual lives in both hope and recollection, at one and the same time, and it is only through this that his life acquires true, substantial continuity.”

– Kierkegaard

নাজিম উদ্দিন এর ব্লগ   ১১৮ বার পঠিত