Avatar

(পূর্ব প্রকাশিতের পর খণ্ড ১)

আমি সন্ধ্যায় আবার ড্রয়িং রুমে এসে বসলাম দুই কাপ কফি হাতে। আব্বুর হাতে একটা কাপ ধরিয়ে দিয়ে বললাম, আর খুব কম প্রশ্ন বাকি রয়েছে। এগুলোর উত্তর পেলেই চলবে। আমি শুরু করলাম–

“আব্বু তুমি নিশ্চয়ই জানো ইসলাম বলে রোজ পাঁচবার নামাজ পরতে হবে। এটা ইসলামে অবশ্য-কর্তব্য। কিন্তু এখনকার কর্মব্যস্ত জীবনে রোজ পাঁচবার নামাজের সময় অনেকের হাতেই থাকে না! এরা কি প্রকৃত মুসলিম?”

–“দ্যাখো, প্রকৃত মুসলিম হলে তাকে তো নামাজ পড়তেই হবে। নবী এই সবের উপরেই সমান গুরুত্ব দিয়েছেন, কলেমা, নামাজ, যাকাত, রোজা, আর সামর্থ্য থাকলে হজ্ব!” এগুলোর একটাও বাদ গেলে হবে না। ইসলামে যা কিছু ফরয তা পালন না করলে তাকে  কি সত্যিকার মুসলিম বলা যায়?”

–“তার মানে তোমার উত্তর হল ‘না’। কিন্তু আমি বা ভাই কেউ তো নামাজ রোজা করি না। আম্মি করে কিন্তু তোমার মতো বাড়াবাড়ি…” 

কথাটা শেষ হতে দিল না আব্বু, “কি বাড়াবাড়ি!” রীতিমত উত্তেজিত হয়ে বলতে লাগলেন, “যা করি আমার ইমান দুরস্ত রাখতে করি। আমি মুসলিম এটা আমার কাছে গর্বের। তোরা করিস না, তোদের কিছু বলি কি? এটাও আমি সেই মহান আল্লাহ-র বাণী মেনেই করি।”

আমি বলতে যাচ্ছিলাম যে তুমি তো মুসলিম বিবেকানন্দ, কিন্তু চেপে যেতে হল। খালি একটা শব্দেই এই অবস্থা! তার উপর একথা বললে কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তার ঠিক নেই! বললাম, “কয়েক বছর আগে যে দেখতাম তুমি রিয়ায কে মারতে শুধু নামাজে না বসার জন্য!”

–“রসুলুল্লাহ বলেছেন, সন্তানের সাত বছর বয়স হলে তাকে নামাজ আদায় করতে বল আর দশ বছরেও যদি সে নামাজ আদায় না করে তাহলে মারধর করো!”

আবু দাউদে আছে জানা সত্ত্বেও আব্বুকে জিজ্ঞাসা করলাম, “কোরআনে আছে?”

“না”, আব্বু বলল, “হাদিসে”।

আমি স্বগতোক্তির ভান করে আব্বুকে শুনিয়ে বললাম, “আল্লাহ্‌র তো দেখি বহুমুখী প্রতিভা! একবার বলে জোর জবরদস্তি নেই, পরক্ষনেই আবার পেটাতে বলে!” 

বলতে বলতেই দেখি আম্মি হাজির টিফিন নিয়ে। আম্মি জানে যে আমি আব্বুকে কতটা ভালবাসি! আমাকে বলল, “হ্যাঁরে তোদের কথা তো শেষই হচ্ছে না।” পাশের ঘরে রিয়ায পড়তে পড়তে খোঁচা দিলো একটু গম্ভীর স্বরে, বোঝো না কেন আম্মি বিপরীত মেরু পরস্পরকে আকর্ষণ করে”। কোনও উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই আবার গুনগুণ করে পড়া শুরু করলো। আমিও কথা বাড়ালাম না। আব্বু দেখি ডিমের টোস্টে কামড় দিয়েছে। আমি গোটা কতক পাঁপড় তুলে নিয়ে আব্বুকে প্রশ্ন করলাম, “আব্বু, যারা নেশা করে নিয়মিত এবং প্রচুর, তারা কি প্রকৃত মুসলমান?”

আব্বু বলে উঠলো, “ তুমি কি জানো না, ইসলামে নেশা করা হারাম! সেই জন্য দ্যাখো মুসলিম দেশগুলোতে মদ্যপানের সংখ্যা প্রায় নেই বললেই চলে!”

–“ তুমি খবর রাখ না আব্বু। তুমি কি জানো বিখ্যাত পত্রিকা ‘দি ইকনমিস্ট’ অনুসারে ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল অব্দি সারা পৃথিবীতে মদ বিক্রি বেড়েছে ৩০ শতাংশ। সেখানে মুসলিম দেশগুলোতে মদ বিক্রি বেড়েছে ৭২ শতাংশ!”

আব্বু অবাক হয়েছে মনে হল। বলল, “সত্যি বলছ! কারো প্রতি অভিযোগ করার আগে কিন্তু একশবার ভেবে নেওয়া উচিত!”

এই নির্দেশ ইসলামে কোথায় আছে তা আমার জানা নেই অবশ্য, কিন্তু আমি আমার বক্তব্য প্রতিষ্ঠার জন্য আরও তথ্য দিয়ে বললাম, “শুধু তাই নয়, কিছু বিশেষ ধরনের ড্রাগ (সেক্স ড্রাগ,সেটা উল্লেখ করিনি)সৌদি আরবে বিশাল পরিমাণে বিক্রি হয়। প্রতি বছরে এই ড্রাগগুলো যে পরিমাণে বিক্রি হয় তা নাস্তিক দেশ রাশিয়ায় বিক্রির দশ গুন। কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে দেখতে গেলে দেখা যাবে সৌদি আরবের জনসংখ্যা রাশিয়ার জনসংখ্যার প্রায় পনের গুণ। তাছাড়া যদি স্মোকিং-এর কথা ধরা যায়, তাহলে দেখতে পাব যে, মুসলিম দেশ গুলোতে স্মোকিং এর প্রবণতা খ্রিস্টান বা ধর্মনিরপেক্ষ দেশগুলোর চেয়ে কম তো নয়ই বরং অনেক ক্ষেত্রেই বেশি। তাহলে এরাও তো প্রকৃত মুসলিম নয়?”

–“নয়” , আব্বু একটু থেমে নিয়ে বললেন।

আমি বললাম, “ কিন্তু স্মোক করা মুসলিম তো নামায রোজা যাকাত হজ্জ  করে, তবুও তো তারা প্রকৃত মুসলিম নয়। তবে যে তুমি বললে যে এসব যারা করে তারাই প্রকৃত মুসলিম –”

আব্বুর মুখে কোনও কথা নেই। আমি বুঝতে পারলাম, আব্বুর সবজান্তা ভাবটা কেটে গিয়েছে। যদিও তা স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। মুসলিম বলতে ঠিক কি বোঝায়, কি কারণে কাউকে প্রকৃত মুসলিম বলা যায়,  তার কোনও স্পষ্ট উত্তর দিতে না পেরে আব্বু যেন বিধ্বস্ত।

— “বাদ দাও! তাহলে এখন বরং একটু রাফ হিসাব করে নিই মুসলিমদের সংখ্যা বিষয়ে–”, বলে আমি একটু সময় নিয়ে আব্বুর কোঁচকানো ভুরুর দিকে একবার আড়চোখে চেয়ে নিয়ে মাথা নিচু করে বলতে শুরু করলাম, “যদিও শিয়া সম্প্রদায়কে সুন্নিরা বারবার অমুসলিম হিসাবে দাবী করে এসেছে এবং তাদের জনসংখ্যা ৩% থেকে ৫% হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করে এসেছে, কিন্তু নিরপেক্ষ অনেক পৃথক  গবেষণা থেকে জানা যায় যে তাদের সংখ্যা ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। আমরা যদি গড়ে ১৫ শতাংশ ধরে নিই। তাহলে ১৫০ কোটি মুসলিমের মধ্যে ২২ কোটি শিয়াদের বাদ দিলে হয় ১২৮ কোটি। এবার ইন্দোনেশিয়ার ২০ কোটি মুসলিম যদি বাদ পড়ে যায়, তাহলে থাকে ১০৮ কোটি। মালয়েশিয়ার ১ কোটি বাদ দিলে থাকে ১০৭ কোটি। এবার এই ১০৭ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক, মানে ৫৩ কোটি নারী। এই নারীদের অধিকাংশ মানে  অন্তত ২৭ কোটি যদি বাদ পরে,তবে থাকে ৮০ কোটি।”

— “না না, এভাবে হিসাব করলে চলে নাকি?” আব্বু আমাকে থামানোর জন্য সচেষ্ট হতেই আমি থামতে বলি, “না আব্বু,আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। আমি বলে নিই একটু থামো, তারপর বোলো”।

আব্বু কেমন যেন চুপ করে গেল। আমি তো জানি এই লজিক ভুল প্রমাণ করা কঠিন বলে আব্বুর যত ছটফটানি। আমি আবার বলতে শুরু করলাম, “এই ৮০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে আমরা ১৪ বছরের কম বয়স্ক পাই ২০% মানে ১৬ কোটি। আর দশ বছরের কম কতজন তা পাওয়া না গেলেও মোটামুটি আন্দাজ করে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তো ধরে নিলাম প্রায় ১০ কোটি। জানি এই ১০ কোটির মধ্যে কয়েক কোটি নারী-শিশু এমন থাকবে যা আগেই বাদ পড়ে গেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা যেহেতু একটা রাফ হিসাব তাই আপাতত এটা ধরেই এগোতে পারি। অর্থাৎ পড়ে রইল ৭০ কোটি। এবার এই ৭০ কোটির কতজন রোজ পাঁচ বার নামায পড়ে? আমাদের পাড়ার হিসাবে ধরলে তুমি একা। সেই হিসাবে ধরলে সংখ্যা কি থাকবে তা তো বোঝাই যায়। আর এসবের হিসাব তো বই, ইন্টারনেট কোথাও পাওয়া যায় না। যদি ধরে নিই যে এর অর্ধেক লোক রোজ পাঁচ বার নামায  পড়ে, তাহলে তো থাকে ৩৫ কোটি।  এরপর ধরো মুসলিম দেশগুলোতে নেশার হার যেভাবে বাড়ছে তাতে তো সৌদি আরব, লেবানন, বাহারিন, ইরাক সেই সব দেশের অধিকাংশই বাদ পড়ে যাবে, ভারতের মতো কাফেরদের আচার আচরণে অভ্যস্তদের কথা তো বাদই দিলাম। তাহলে সত্যিকার মুসলিম ঠিক কত আব্বু? আর তোমাদের মতে তো শুধু নামে মুসলিম হলেই মুসলিম হয় না। এরপরও সমস্ত মুসলিমরা গলা ফাটায় এই বলে যে—“Islam is the fastest growing community”

যত রাগ আছে সমস্ত ঝেড়ে দিয়ে চুপ করতেই আব্বু ঘড়ির দিকে ঈশারা করে বলল, “তাকিয়ে দ্যাখ কটা বাজে। চল খেতে যেতে হবে। তোর আম্মি ডাকছে মনে হয়।” ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত্রি এগারোটা চার বাজে। আম্মি দরজার কোনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল এতক্ষণ মনে হয়। দেখি রীতিমত ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে। আমি কথাটা কেয়ার না করার ভাণ করে বললাম, “কি যেন বলছিলে না?”

— “কথা পরে। আগে চলো খেতে হবে। আম্মিকে তো বাসন ধুতে হবে নাকি?”

আমি গলার টোনে বুঝে গেলাম, সেই পরেটা আর আসছে না। বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল। এর মাঝে অনেকক্ষণ অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তবু আব্বু ওই প্রসঙ্গ আর টেনে আনেন নি। আমি আনার একাধিক চেষ্টা করলেও আব্বু সন্তর্পনে এড়িয়ে গেছেন।

যাই হোক, আরও অনেক বিষয় বাকি রয়ে গেল আলোচনার। সমস্ত দিক বিবেচনা করে অপসারন পদ্ধতিতে এগিয়ে চললে দেখা যাবে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর দশা, মানে সত্যিকার মুসলিম বলে শেষমেশ কিছুই পাওয়া যাবে না হয়তো। তবে মুসলিমরা ‘সত্যিকার মুসলিম’ নামক এই শূন্যগর্ভ ধারনাটিকে নিয়ে এত মাতামাতি কেন করে? সেই আলোচনা নয় পরে আরেকদিন হবে। শুধু আফসোস, শেষ প্রশ্নটা আব্বুকে আর করা হল না। তবে একদিন নিশ্চয়ই করবো প্রশ্নটা — তুমিও কি সত্যিকারের মুসলি?

0 Shares