নবযুগ সম্পাদক

সতর্কতা:

দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস‘ উপন্যাসের বাংলা ভার্সন প্রকাশকের পূর্বানুমতি ছাড়া অন্য কোন মাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না, কিংবা অনলাইন বা অফলাইন কোনো মাধ্যমেই ই-বুক করে বিতরণ করা যাবে না। কেউ এ ধরনের কাজ করলে তা আইনবিরুদ্ধ কাজ হিসেবে পরিগণিত হবে।

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:

বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস‘ বইটির বাংলা সংস্করণ বাংলাদেশের প্রথিতযশা প্রকাশনা ‘চারদিক’ থেকে শীঘ্রই প্রকাশিত হবে, যা অনুবাদ করেছেন সা‌লেহ মুহাম্মদ। বইটির ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা ও কৌতুহলের কারণে এই প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারীর সাথে যোগাযোগ করি। তাঁকে অনুরোধ করি আমরা যেসব বাঙালিরা প্রবাসে আছি, যাঁরা ইচ্ছে থাকলেও বাংলা বই সংগ্রহ করতে পারি না, সেইসব পাঠকদের জন্য নবযুগ ব্লগে বইটির বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করলে পাঠকরা উপকৃত হতো। চারদিক কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছেন এবং আজ থেকে অরুন্ধতী রায়ের ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ বইটির বাংলা সংস্করণ ধারাবাহিকভাবে নবযুগ ব্লগে প্রকাশ হবে। এজন্য ‘চারদিক’ প্রকাশনীর প্রতি রইল অশেষ কৃতজ্ঞতা। নবযুগের পাঠকদের নিয়মিত নজর রাখার অনুরোধ রইল। পাশাপাশি যাদের পক্ষে সম্ভব তাঁরা বইটির হার্ডকপি সংগ্রহ করতে পারেন। বইটি শীঘ্রই প্রকাশিত হবে।  – ধন্যবাদ

======================

 

২.

খোয়াবগা          

তিনি ছিলেন পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ। জন্মেছিলেন জানুয়ারির এক শীতল রাতে, কুপির আলোয় (বিদ্যুৎ বন্ধ ছিল), শাহজাহানবাদে, দিল্লির দেয়াল ঘেরা শহরটিতে। আহলাম বাজি, যেই ধাত্রী তাঁকে প্রসব করাল আর দুটো শাল দিয়ে জড়িয়ে তাঁর মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলল, “ছেলে হয়েছে।” তখনকার পরিস্থিতির বিবেচনায়, তাঁর ভুলটি বোধগম্য।

সন্তানধারণের প্রথম মাসের মধ্যেই জাহানারা বেগম এবং তার স্বামী ঠিক করেছিলেন যে, যদি তাদের বাচ্চাটি পুত্র হয়, তবে তার নাম রাখবেন তারা আফতাব। তাদের প্রথম তিনটি সন্তান ছিল কত্যা। ছয় বছর যাবত তারা তাদের আফতাবের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি জন্মালেন যেই রাতে সেটি ছিল জাহানারা বেগমের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের।

পরদিন সকালে, যখন সূর্য উঠেছে আর চমৎকার উষ্ণ হয়েছে ঘরটা, তিনি ছোট্ট আফতাবের গায়ে জড়ানো কাপড়গুলো খুললেন। পর্যবেক্ষণ করলেন তার ক্ষুদ্র শরীরটা-চোখ নাক মাথা গলা বগল হাত পায়ের আঙুল- ধীর তৃপ্ত উল্লাসে। তখনই তিনি আবিষ্কারটি করলেন। তার পুরুষাঙ্গটির নিচে লুকিয়ে আছে, ছোট, অগঠিত, কিন্তু সন্দেহাতীত ভাবে একটি নারী-অঙ্গ।

কোন মায়ের পক্ষে কি সম্ভব নিজের বাচ্চার ভয়ে দিশেহারা হওয়া? জাহানারা বেগম হয়েছিলেন। তার প্রথম প্রতিক্রিয়াটি ছিল, এরকম একটি অনুভুতি যে তার হৃদযন্ত্রটি থেমে গেছে এবং তার হাড়গুলো ভস্ম হয়ে যাচ্ছে। তার দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটি ছিল, তিনি কোন ভুল করেননি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরেকবার দেখা। তার তৃতীয় প্রতিক্রিয়া ছিল, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা থেকে দ্রুত পিছিয়ে আসা। এই সময় তার দেহাভ্যন্তরে একটা গোলযোগ ঘটে গেল এবং মলের একটি ক্ষীণধারা তার পা বেয়ে গড়িয়ে নামতে লাগল। তার চতুর্থ প্রতিক্রিয়াটি ছিল, নিজেকে এবং নিজের সন্তানটিকে মেরে ফেলার ব্যাপারে মনস্থ করা। তার পঞ্চম প্রতিক্রিয়াটি ছিল, যে তিনি তার বাচ্চাটিকে তুলে নিলেন এবং নিজের কাছে আঁকড়ে ধরলেন। আর সেই অবস্থায় তিনি তার চেনা বিশ্ব এবং যেসব বিশ্বের অস্তিত্ব সমন্ধে তিনি জানতেন না কোনদিন, তাদের মাঝখানের একটা ফাটল দিয়ে নিচে পড়ে যেতে লাগলেন। সেখানে, সেই অতল গহ্বরটিতে, আধারের মাঝে ঘুরতে ঘুরতে, এতদিন পর্যন্ত যা কিছুর ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন তিনি, প্রত্যেকটা জিনিষ, সবচেয়ে ক্ষুদ্র থেকে নিয়ে সবচেয়ে বড় পর্যন্ত, তার কাছে অর্থবহ হওয়া বন্ধ করে দিল। উর্দুতে, তার জানা একমাত্র ভাষাটিতে, সব জিনিষের, শুধু  জিনিসের নয় বরং সকল জিনিসের- এমনকি কার্পেট, কাপড়, বই, কলম, বাদ্যযন্ত্র- সকল কিছুরই একটা লিঙ্গ আছে। সবকিছ্ইু হয় পুংলিঙ্গ অথবা স্ত্রীলিঙ্গ। শুধুমাত্র তার বাচ্চাটি ছাড়া। হ্যাঁ অবশ্যই তিনি জানতেন যে তার বাচ্চার মতদের জন্য একটা শব্দ আছে-হিজরা। শব্দ আসলে দুটো, হিজরা এবং কিন্নার। কিন্তু দুটো শব্দ মিলে তো একটা ভাষা হয় না।

এটা কি সম্ভব ভাষার বাইরে বসবাস করা? স্বভাবতই এই প্রশ্নটি জাহানারার কাছে নিজেকে সম্ভাষিত করল না একটিমাত্র শব্দের মাধ্যমে, বা একটি প্রাঞ্জল বাক্যের দ্বারা। সে নিজেকে তার কাছে সম্ভাষিত করল একটি আওয়াজহীন, আদিম হাহাকার হিসেবে।

তার ষষ্ঠ প্রতিক্রিয়াটি ছিল, নিজের শরীর পরিষ্কার করা এবং এই মুহূর্তে কাউকে কিছু না জানানোর সংকল্প করা। এমনকি তার স্বামীকেও না। তার সপ্তম প্রতিক্রিয়া ছিল, শুয়ে পড়া আফতাবের পাশে এবং বিশ্রাম নেয়া। যেমনটা করেছিলেন খ্রিস্টানদের ঈশ্বর। যখন তিনি স্বর্গ এবং পৃথিবী নির্মাণ সমাপ্ত করলেন। পার্থক্য হল যে ঈশ্বরের ক্ষেত্রে তিনি বিশ্রাম করেছিলেন নিজের সৃষ্ট জগতটিকে একটি অর্থ প্রদানের পর। যেখানে জাহানারা বেগম বিশ্রাম করছিলেন তার সৃষ্টটি তার জগতের অর্থকে তছনছ করে দেয়ার পর।

যত যাই হোক ওটা কোন আসল যোনি না, তিনি নিজেকে বোঝালেন। ওটার পথগুলো খোলা নয় (তিনি পরীক্ষা করেছেন)। ওটা একটা উপাঙ্গ মাত্র, বাচ্চা-কাচ্চাদের থাকে এসব। হয়তোবা এটা বন্ধ হয়ে যাবে, বা সেরে যাবে, বা চলে যাবে কোন একভাবে। তিনি তার পরিচিত সবকটা দর্গায় মানত করবেন আর সর্বশক্তিমানকে বলবেন তাকে রহমত করার জন্য। সর্বশক্তিমান নিশ্চয়ই করবেন। জাহানারা জানেন তিনি করবেন। আর হয়তোবা তিনি করেছিলেনও। যেভাবে করেছিলেন সেটা হয়তো জাহানারা বুঝতে পারেননি পুরোপুরি।

প্রথম যেদিন শরীরে জোর পেলেন জাহানারা বেগম শিশু আফতাবকে সাথে নিয়ে গেলেন হযরত শারমাদ শহীদের দরগায়। দর্গাটি তার বাড়ি থেকে একটা সরল দশ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। হযরত শারমাদ শহীদের কাহিনীটি জাহানারা তখনও জানতেন না। তার কোন ধারণাও ছিল না কীসে তার পদযাত্রাটিকে হুজুরের দরগার দিকেই ধাবিত করল। হয়তোবা হুজুর তাকে নিজের কাছে ডেকে নিয়েছেন। অথবা সেখানে তাঁবু করে বসবাসরত অদ্ভুত মানুষগুলো তাকে আকর্ষণ করেছিল কোন একভাবে। মীনা বাজার যাওয়ার পথে এই মানুষগুলোকে তিনি প্রায়ই দেখতেন। তার আগের জীবনে জাহানারা এই ধরনের লোকদের প্রতি কৃপাপরবশেও তাকানোর দরকার মনে করেননি, যদি না তারা রাস্তাঘাটে তার সামনে পড়ে গেছে। হঠাৎ করে তাদেরকেই মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

হযরত শারমাদ শহীদের দর্গায় আগমনকারীদের সকলে হুজুরের গল্পটি জানত না। কেউ কিছু অংশ জানত, কেউ কিছুই জানত না, এবং কেউ তাদের নিজস্ব সংস্করণ বানিয়ে নিত। অধিকাংশ লোকে জানত যে শারমাদ ছিলেন একজন ইহুদী আর্মেনীয় বণিক, যিনি নিজের জীবনের প্রেমিকটিকে অনুসরণ করতে করতে পারশিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে দিল্লি চলে এসেছিলেন। কম লোকই জানত যে তার জীবনের প্রেমিকটি ছিল অভয় চাঁদ, একজন কমবয়সী হিন্দু বালক যার সাথে তার দেখা হয়েছিল সিন্ধুতে। বেশির ভাগ লোক জানত যে তিনি ইহুদীবাদ ত্যাগ করে ইসলামকে গ্রহণ করেছিলেন। কম লোকই জানত যে আধ্যাত্মিক সাধনার একটি পর্যায়ে গতানুগতিক ইসলাম থেকেও তার মন উঠে যায়। অধিকাংশ লোক জানত শারমাদ হুজুর জীবনযাপন করতেন শাহজাহানবাদের রাস্তাঘাটে একজন নগ্নফকির হিসেবে। পরে একদিন তাকে জনসমক্ষে হত্যা করা হয়। কম লোকেই জানত তাকে হত্যার কারণটি জনসমক্ষে নগ্ন থাকার অপরাধ নয় বরঞ্চ তার অপরাধের কারণটি ছিল স্বধর্ম ত্যাগ। আওরঙ্গযেব, তৎকালীন সম্রাট, তাকে নিজের দরবারে ডেকে পাঠাল এবং তাকে বলল প্রমাণ করতে যে তিনি একজন প্রকৃত মুসলিম। তিনি তাকে পাঠ করতে বললেন কালিমা: লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসুল্ল্লুাহ- আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (স.) তার বার্তাবহণকারী। লাল দুর্গের রাজদরবারে কাজী আর মাওলানাদের একটি জুরির সামনে শরমাদ নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আকাশে মেঘেদের ভেসে বেড়ানো বন্ধ হয়ে গেলো, উড়ন্ত পাখিরা মাঝপথে স্থির হয়ে গেল, দুর্গের ভেতরের বাতাস ক্রমশ ঘন আর দুর্ভেদ্য হয়ে উঠল যখন তিনি কালিমা পাঠ শুরু করলেন। কিন্তু তিনি শুরু করতে না করতেই থেমে গেলেন। তিনি বললেন শুধু প্রথম অংশটুকু: লা ইলাহা। কোন ঈশ্বর নেই। এর বেশি আর অগ্রসর হওয়া তার হবে না, হুজুর দৃঢ়কন্ঠে জানালেন, যতক্ষণ না তিনি তার আধ্যাত্মিক সাধনা সমাপ্ত করছেন এবং ঈশ্বরকে গ্রহণ করতে পারছেন নিজের সমস্ত হৃদয় দিয়ে। তার আগপর্যন্ত, তিনি বললেন, কালিমা পাঠ করা হবে শুধুই প্রার্থনা নিয়ে তামাশা করা। কাজীদের সমর্থনক্রমে, আওরঙ্গজেব শারমাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলেন।

এর থেকে যদি এমনটা ধরে নেয়া হয় যে, এই গল্পটি না জেনেই যারা তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হযরত শারমাদ শহীদের কাছে গিয়েছেন তারা সেটা করেছেন অজ্ঞতাবশত, ইতিহাস আর সত্যের ব্যাপারে খুব বেশি সচেতন না হয়ে, তাহলে ভুল হবে। কারণ দর্গার ভেতরে, শরমাদের স্বাধীন আত্মাটি, প্রবল, অনুভবযোগ্য, এবং যেকোন ঐতিহাসিক তথ্যাবলীর স্তুপের থেকে অনেক বেশি সত্য হয়ে দেখা দিত তাদের সামনে যারা তাঁর দোয়াকামী। এটা উদযাপন করত (কিন্তু কখনও উপদেশ দিত না) ধর্মীয় দীক্ষাদানের বদলে আধ্যাত্মিকতার শুদ্ধ শক্তিকে, বিত্ত আর জিদের তুলনায় সারল্যকে, এমনকি নিঃশেষিত হওয়ার সম্মুখ সম্ভাবনার সামনে পরমানন্দদায়ক প্রেমকে। শারমাদের আত্মা তাঁর কাছে আগতদেরকে অনুমতি দিত তার গল্পটিকে নেয়ার এবং তাদের সেটাকে যা হওয়া প্রয়োজন তাই বানিয়ে নেয়ার।

যখন জাহানারা বেগম দর্গায় একটি পরিচিত মুখ হয়ে গেল তখন সে গল্পটি শুনল (এবং তারপর প্রচার করে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিল) যে কিভাবে শারমাদের শিরচ্ছেদ করা হয়েছিল জামা মসজিদের সিঁড়িতে এক বিশাল জনতার সম্মুখে যারা তাকে ভালোবাসত এবং সেদিন সমবেত হয়েছিল তাকে বিদায় জানাতে। যে কিভাবে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরেও হুজুরের মস্তকটি আবৃত্তি করে যাচ্ছিল তার প্রেমের কবিতাগুলো, এবং কিভাবে তিনি তার বাক্যরত মাথাটিকে তুলে নিলেন, যেরকম স্বাভাবিকভাবে আজকের দিনের একজন মটরসাইকেল চালককে দেখা যায় তার হেলমেটটিকে তুলে নিতে, আর হেঁটে উঠলেন জামা মসজিদের সিঁড়ি ধরে এবং তারপর, ওই একইরকম সাবলীলভাবে, সরাসরি স্বর্গে চলে গেলেন। সেই কারণেই, জাহানারা বেগম বলত (শুনতে ইচ্ছুক যে কাউকে), হযরত শারমাদের ক্ষুদ্র দর্গায় (যেটা পর্বতের গায়ে সেঁটে থাকা শামুকের মত আটকে ছিল জামা মসজিদের পূর্বদিকের সিঁড়ির ধাপগুলোতে, সেই একই জায়গা যেখানে তার রক্ত গড়িয়ে পড়ে একটা ছোটখাট পুকুরের মত তৈরি করেছিল), মেঝেটি লাল, দেয়ালগুলো লাল এবং ছাদটি লাল। তিনশ বছরের উপর চলে গেছে, তিনি বলতেন, কিন্তু হযরত শারমাদের রক্ত ধুয়ে ফেলা যায়নি। যে রঙেই তারা রঙ করুক না কেন তার দর্গাটিকে, জাহানারা বেগম জোর দিয়ে বলতেন, সময়ের সাথে সাথে এটা নিজে থেকেই লাল হয়ে যায়।

প্রথমাবারের মত যখন জাহানারা পার হলেন সেই জনতার ভীড়টি-আতর আর তাবিজের দোকানদাররা, দর্গায় আগতদের জুতার জিম্মাদাররা, খোড়া-আতুররা, ভিখারীরা, ঘরহারারা, ঈদে কোরাবানির জন্য মোটা করা হচ্ছিল যেই ছাগলগুলাকে, আর নীরব বয়স্ক খোঁজাদের যেই জটলাটি সংসার পেতেছিল দর্গার বাইরে একটি তার্পোলিনের নিচে- এবং ক্ষুদ্র লালরঙের কক্ষটিতে প্রবেশ করলেন, জাহানারা বেগম শান্ত হয়ে গেলেন। রাস্তার শব্দগুলো ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল আর মনে হল খুব দূর থেকে আসছে। তিনি এক কোনায় বসলেন কোলে তার ঘুমন্ত সন্তানটিকে নিয়ে, দেখতে লাগলেন লোকজনদের, মুসলিম এবং সেই সাথে হিন্দুরা, একজন দুজন করে আসে, আর সমাধিটির চারপাশের গ্রীলে লাল সুতা, লাল চুড়ি আর কাগজের টুকরা বেঁধে দেয়, সকাতরে প্রার্থনা করছে শারমাদ যেন তাদের আশীর্বাদ করেন। একমাত্র যখন জাহানারা বেগম খেয়াল করলেন ঘষাকাঁচের মত অস্বচ্ছ শরীরের এক বৃদ্ধ লোককে, যিনি তার কাগজের মত চামড়া আর আলো দিয়ে বোনা সুতার মত দাঁড়ি নিয়ে এক কোনায় বসে আছেন, দোলা খাচ্ছেন সামনে পিছে, নীরবে কেঁদে চলেছেন যেন তার হৃদয় ভেঙে গেছে, তখন জাহানারা নিজের অশ্রুধারাকে বইতে দিলেন। এই আমার ছেলে, আফতাব, তিনি ফিসফিস করে বললেন হযরত শারমাদকে। আমি তাকে এখানে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি। তার দিকে খেয়াল রাখবেন। আর আমাকে শেখান কিভাবে তাকে ভালোবাসব।

 হযরত শারমাদ তেমনটাই করেছিলেন।

***

আফতাবের জীবনের প্রথম কয়েক বছরে, জাহানারা বেগমের গোপনীয়তাটি নিরাপদে ছিল। তিনি অপেক্ষা করছিলেন আফতাবের নারী-অঙ্গটি সেরে যাবার জন্য। একই সময়ে তিনি পুত্রকে সবসময় কাছে কাছে রাখতেন এবং তার ব্যাপারে হিংস্রভাবে রক্ষণমূলক ছিলেন। এমনকি তার ছোট ছেলে সাকিব জন্মানোর পরও তিনি নিজের কাছ থেকে বেশিদূরে আফতাবকে একা একা যেতে দিতেন না। একজন মহিলা যিনি এতদিন ধরে এত দুশ্চিন্তার সাথে একটি পুত্রের জন্য অপেক্ষা করেছেন তার জন্য এই ধরনের আচরণকে খুব একটা অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হতো না।

আফতাবের বয়স যখন পাঁচ সে চুড়িওয়ালী গলিতে ছেলেদের উর্দু-হিন্দি মাদ্রাসায় পড়তে যেতে শুরু করল। এক বছরের মধ্যে সে কোরানের একটা ভালো পরিমাণ অংশ আরবীতে তেলওয়াত করতে পারত, যদিও এটা পরিষ্কার নয় যে তার কতটুকু সে বুঝতে পারত-তবে সেটা সত্য ছিল অন্য বাচ্চাগুলোর ব্যাপারেও। আফতাব সাধারণের থেকে ভালো ছাত্র ছিল, কিন্তু সে যখন খুব ছোট তখন থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠল যে তার আসল গুণ হল সংগীতে। তার একটা মিষ্টি, প্রকৃত গান গাওয়ার কন্ঠ ছিল এবং মাত্র একবার শুনেই সে একটা সুরকে তুলে নিতে পারত। তার বাবা-মা ঠিক করল তাকে উস্তাদ হামিদ খানের কাছে পাঠানোর, একজন অসামান্য কমবয়স্ক সংগীতজ্ঞ যিনি চাঁদনী মহলে তার সংকীর্ণ ঘরগুলোতে বাচ্চাদের দলগুলোকে ভারতীয় ক্লাসিকাল সংগীত শেখাতেন। ছোট আফতাব কোনদিন একটা ক্লাসও বাদ দিত না। যখন তার বয়স নয় হয়েছে, সে রাগ ইয়ামান, দুর্গা আর ভৈরবীতে বাড়া খায়াল এর পুরো একটি বিশমিনিটের মত অংশ গাইতে পারত আর রাগ পুরিয়া ধানাশ্রির সমতল রেখাবটি থেকে তার কন্ঠকে আলতো করে উঠিয়ে নিতে পারত যেন পুকুরের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে একটা পাথরের টুকরা লাফিয়ে চলে যাচ্ছে। লক্ষণৌয়ের একজন রাজ-গণিকার দক্ষতা আর ভঙ্গিমা নিয়ে সে চৈতী আর ঠুমরী গাইতে পারত। প্রথমদিকে লোকজন মুগ্ধ হতো এবং এমনকি উৎসাহও দিত, কিন্তু শীঘ্রই অন্য ছেলেমেয়েদের ঠাট্টা আর জ্বালাতনটি শুরু হয়ে গেল: ও একটা মেয়ে। ও মেয়েও না ছেলেও না। ও একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। মেয়ে-ছেলে। ছেলে-মেয়ে হে! হে! হে!

জ্বালাতন যখন সহ্যাতীত হয়ে উঠল আফতাব তার সংগীতের ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিল। কিন্তু ওস্তাদ হামিদ খান, যিনি খুব ভালোবাসতেন তাকে, নিজে নিজে তাকে আলাদা করে শেখাতে চাইলেন। তাই সংগীতের ক্লাসগুলো চালু থাকল, কিন্তু আফতাব আর স্কুলে যেতে চাইত না। ততদিনে জাহানারা বেগমের আশাগুলো কম বেশি ম্লান হয়ে গেছে। দিগন্তের কোথাও সেরে যাওয়ার কোন ইশারা নেই। কিছু সৃষ্টিশীল অজুহাত তৈরি করে তিনি গত কয়েক বছর ধরে আফতাবের খৎনার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। কিন্তু ছোট সাকিব তারটার জন্য লাইনে আপেক্ষা করছিল, এবং তিনি জানতেন তার সময় ফুরিয়ে গেছে। শেষপর্যন্ত তিনি তার যা করার ছিল তাই করলেন। তিনি অন্তরে সাহস সঞ্চয় করলেন আর তার স্বামীকে জানালেন, শোকে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ে এবং একই সাথে এই শান্তির সাথে যে অবশেষে তার অন্য কেউ একজন আছে যার সাথে তিনি তার দুঃস্বপ্নকে ভাগ করে নিতে পারছেন।

তার স্বামী, মুলাকাত আলি ছিল একজন হাকিম, ভেষজ চিকিৎসার একজন ডাক্তার এবং উর্দু ও পারশিয়ান কাব্যের এক প্রেমিক। তার সারাটা জীবন তিনি আরেকজন হাকিমের পরিবারের জন্য কাজ করেছেন-হাকিম আব্দুল মাজিদ, যিনি ‘রূহ আফজা’ (পারশিয়ানে আত্মার মহৌষধ) নামক একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের শরবতের উদ্যোক্তা ছিলেন। রূহ আফজা, যা তৈরি হতো খুরফার বিচি, আঙুর, কমলা, তরমুজ, পুদিনা, গাজর, সামান্য পালংশাক, খুস খুস, শাপলা, দুই ধরনের লিলি আর দামাস্কর গোলাপের নির্যাস থেকে, বানানো হয়েছিল একপ্রকার টনিক হিসেবে। কিন্তু লোকজন দেখল যে ঝিকমিকে রুবী-রঙের তরলটির দুই টেবিল চামচ একগ্লাস ঠান্ডা দুধে বা সাধারণ পানিতে মেশালে শুধু স্বাদেই চমৎকার লাগে না বরঞ্চ দিল্লির আগুনের মত গ্রীষ্ম এবং মরুভুমির বাতাসে বহমান অদ্ভুত জ্বরজারিগুলোর বিরুদ্ধে সেটি একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা। দ্রুতই যার সূচনা ঘটেছিল ঔষধ হিসেবে তা হয়ে গেল ওই এলাকার একটি জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন পানীয়। রুহ আফজা হয়ে উঠল একটি বর্ধিষ্ণু ব্যবসা এবং একটি সাংসারিক নাম। চল্লিশ বছর ধরে এটি বাজার শাসন করল, তারা হেডকোয়ার্টার থেকে পণ্য পাঠাত পুরাতন শহরে অনেক দক্ষিণে সেই হায়দারাবাদ পর্যন্ত এবং অনেক পশ্চিমে সেই আফগানিস্তান পর্যন্ত।

এর পর আসল দেশভাগ। ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যকার নতুন সীমানায় ঈশ্বরের কন্ঠের ধমনীটি ফেটে খুলে গেল এবং লাখ লাখে মানুষ মারা গেল ঘৃণাজনিত কারণে। প্রতিবেশীরা দাঁড়িয়ে গেল একে অন্যের বিপক্ষে, যেন তারা কোনদিন একে অন্যকে চিনত না, কখনও একে অন্যের বিয়েতে যাইনি, কখনও গায়নি একে অন্যের গান। দেয়ালঘেরা শহরটা ভেঙে খুলে গেল। পুরান পরিবারগুলো (মুসলিম) পালাল। নতুনরা (হিন্দুরা) এসে পৌছাল আর সংসার পাতাল শহরের দেয়ালগুলোর আশেপাশে। রুফ আফজা বেশ ভালোভাবেই পিছিয়ে পড়ল, তবে সামলে নিল দ্রুতই আর পাকিস্তানে একটা শাখা খুলল। শতাব্দীর এক সিকিভাগ পার হলে, পূর্ব পাকিস্তানে ঘটা নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞটির পর, এটি বাংলাদেশের আনকোড়া নতুন রাষ্ট্রটিতে একটি নতুন শাখা খুলল। তবে শেষমেষ, যে আত্মার মহৌষধটি টিকে থেকেছে যুদ্ধ আর তিনটি দেশের রক্তস্নাত জন্মের মধ্য দিয়ে, ধরা খেয়ে গেল, পৃথিবীর অন্য আর সবকিছুর মতই, কোকা-কোলার কাছে।

যদিও মুলাকাত আলি একজন বিশ্বস্ত আর মূল্যায়িত কর্মচারী ছিলেন হাকিম আব্দুল মজিদের, যে বেতন তিনি পেতেন তা সংসার চালানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই তার কর্মঘন্টাগুলোর বাইরের সময়টাতে তিনি বাসায় রোগী দেখতেন। তার সাদা সূতির গান্ধী টুপি বানানোর আয় থেকে জাহানারা বেগম সংসারের ইনকামে যোগ করতেন, যেগুলো তিনি চাঁদনি চকের হিন্দু দোকানদারদের কাছে পাঠাতেন স্তুপে স্তুপে।

মুলাকাত আলি তার পারিবারিক বংশরেখাটিকে চিহ্নিত করতে পারতেন সরাসরি মঙ্গলীয় সম্রাট চেঙ্গিজ খান পর্যন্ত। তার মাধ্যমটি ছিল সম্রাটের দ্বিতীয় পুত্র চাগাতাই। মুলাকাত আলির কাছে ছিল ফাটা ফাটা একটি চর্মখণ্ডের উপর অঙ্কিত বিশদ এক বংশলতিকা আর একটি ছোট টিনের ট্রাঙ্ক ভর্তি ছেড়া, হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরা যেগুলো তিনি বিশ্বাস করতেন যে তার দাবীকে প্রতিষ্ঠিত করে আর ব্যাখ্যা করে কিভাবে গোবি মরুভূমি থেকে শামানের বংশধররা, অন্তহীন নীল আকাশের উপাসকরা, যাদেরকে একসময় ইসলামের শত্রু মনে করা হতো, হয়ে গেল সেই মোঘল সাম্রাজ্যের পূর্বপুরুষ যারা শত শত বছর ভারতকে শাসন করেছিল, আর কিভাবে মুলাকাত আলির নিজের পরিবার, বংশধর সেই মোঘলদের, যারা ছিল সুন্নি, হয়ে গেল শিয়া। হঠাৎ হঠাৎ, হয়তো প্রতি কয়েক বছরে একবার, তিনি তার ট্রাঙ্কটি খুলতেন আর তার কাগজগুলো দেখাতেন কোন বেড়াতে আসা সাংবাদিককে যিনি, অধিকাংশ সময়ই, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেনও না বা তাকে গুরুত্বসহকারেও নেবেন না। খুব বেশি হলে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি একটি কৌতুকপূর্ণ, অদ্ভুত উল্লেখ্য হিসেবে পুরাতন দিল্লির ওপর সপ্তাহান্তের বিশেষ সংখ্যায় জায়গা পেতে পারে। যদি আয়োজনটি দুই পাতা জুড়ে হয় সেক্ষেত্রে, মুলাকাত আলির একটি ক্ষুদ্র পোট্রেটও থাকতে পারে সেখানে, সাথে মোঘলদের রান্নাঘরের কিছু কাছ থেকে তোলা ছবি, সরু নোংরা গলিগুলোতে স্তুপ করে থাকা সাইকেল রিক্সায় বসা বোরখা পরা মহিলাদের দূর থেকে তোলা ছবি এবং অবশ্যই সেই অতিআবশ্যকীয় উপর থেকে তোলা সাদা টুপি মাথায় হাজার হাজার মুসলিম লোকদের ছবি, নিঁখুত সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, জামা মসজিদের জামাতের নামাজে রুকু করছে। কিছু পাঠক এই ছবিগুলোকে ইহবাদ ও অন্য ধর্মমত সহিষ্ণুতার ব্যাপারে ভারতের একনিষ্ঠতার সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে দেখতেন। অন্যরা তার মধ্যে একটি ঈষৎ প্রশান্তি মিশ্রিত করতেন যে দিল্লির মুসলিম জনতাকে দেখে মনে হচ্ছে তারা তাদের প্রাণচঞ্চল পাড়াটিতে যথেষ্ট সুখেই আছে। তারপরেও অন্যরা ছিল যারা এগুলোকে দেখত প্রমাণ হিসেবে যে মুসলিমরা স্বাভাবিক মানুষদের সাথে মিলে নিজেদের ‘জাতিগতভাবে পূর্ণ’ করে তোলার কোন ইচ্ছা রাখে না এবং তারা ব্যস্ত রয়েছে সন্তান উৎপাদনে ও নিজেদেরকে গোছানোতে, আর শীঘ্রই তারা একটা হুমকি হয়ে উঠবে হিন্দু ভারতের জন্যে। এই মতবাদটির অংশীদাররা একটি আশংকাজনক হারে প্রভাব বিস্তার করছিলেন।

খবরের কাগজে কি আসল বা আসল না কি ছাপা হতো কি ছাপা হতো না। সেই বিবেচনায় না গিয়ে, অপসৃয়মান স্মরণশক্তি বা অতি অনুরাগবশত মুলাকাত আলি তার ক্ষুদ্র ঘরগুলোতে অতিথিদের স্বাগত জানাতেন একজন পদমর্যাদাবান ব্যক্তির ম্লান মাধুর্য নিয়ে। তিনি অতীত নিয়ে আলোচনা করতেন দম্ভের সাথে কিন্তু কখনই ব্যাকুলতার সাথে নয়। তিনি বর্ণনা করতেন কিভাবে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, তার পূর্বপুরুষরা একটি সাম্রাজ্য শাসন করেছে যার বিস্তৃতি ছিল যেই দেশগুলো আজকে নিজেদের ডাকে ভিয়েতনাম আর কোরিয়া-তাদের থেকে শুরু করে সেই হাঙ্গেরী আর বলকান পর্যন্ত, উত্তরের সাইবেরিয়া থেকে শুরু করে ভারতের ডেকান মালভূমি পর্যন্ত, যার থেকে বড় কোন সাম্রাজ্য এই বিশ্ব কোনদিন দেখেনি। তিনি বেশির ভাগ সময়েই সাক্ষাৎকারটি সমাপ্ত করতেন তার প্রিয় কবিদের একজন মীর ত্বাকী মীরের একটি দ্বিপদী উর্দু পঙক্তিমালার আবৃত্তি দিয়ে:

জিস সার কো ঘুরুর আজ হ্যায় ইয়ে তাজ ভারি কা

কাল উস পে ইয়াহি শোর হ্যায় ফির নওহাগারি কা

যে মস্তক আজ প্রবল দম্ভে মুকুট শোভিত করে

আগামীকাল সে, ঠিক এখানেই, মহাশোকে ডুবে মরে

তার অধিকাংশ অতিথিরা, একটি নতুন শাসকশ্রেণির দুর্বিনিত গুপ্তচররা, নিজেদের যৌবনজনিত অহমিকার ব্যাপারে অসচেতন যারা, তার ঠিক পুরোপুরি ধরতে পারতেন না তাদের কাছে এই মাত্র নিবেদিত দ্বিপদী কাব্যটির অন্তর্নিহিত অর্থটি কি, যেন কোন তেলে ভাজা খাবার যেটাকে একটি কাপের আংটায় ধরে মিষ্টি ঘন চা পানের মাধ্যমে গলা দিয়ে নামাতে হচ্ছে। এটুকু তারা অবশ্যই বুঝতেন যে এটি ছিল একটি শোকগীতি কোন পতিত সম্রাটের জন্য যার আন্তর্জাতিক সীমানাগুলো সংকুচিত হতে হতে একটা জীর্ণ বস্তিতে এসে ঠেকেছে। সেই বস্তির চতুর্পাশ একটি পুরাতন শহরের ধ্বংসপ্রাপ্ত দেয়াল দিয়ে ঘেরা। আর হ্যাঁ, এটুকুও তারা বুঝত যে একই সাথে মুলাকাত আলির নিজের দারিদ্রপীড়িত অবস্থা নিয়ে এটি একটি অনুতাপমূলক মন্তব্য ছিল। তাদের কাছে যেটা ধরা দিত না তা হল যে এই দ্বিপদী কাব্যটি ছিল একটি চতুর জলখাবার, একটি ছলনাময় সমুচা, বিলাপে জড়ানো একটি সাবধানবাণী, বেখাপ্পা বিনম্রতায় যাকে নিবেদন করছেন একজন যথেষ্ট বুদ্ধিমান লোক যার পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস ছিল তার শ্রোতাদের উর্দুর অজ্ঞতা নিয়ে, একটি ভাষা যেটি, যারা তাতে কথা বলত তাদের মতই, ধীরে ধীরে মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছিল।

মুলাকাত আলির কাব্যের প্রতি অনুরাগটি তার হাকিমের পেশা থেকে ভিন্ন একটি শখমাত্র ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কবিতা সারিয়ে তুলতে পারে, অথবা সারিয়ে তোলার পথে অনেক দূর যেতে পারে। তিনি তার রোগীদেরকে কবিতার পরামর্শ দিতেন যেভাবে অন্য হাকিমরা তাদের রোগীদেরকে পরামর্শ দিতেন ঔষধের। তিনি তার বিপুল সংগ্রহ থেকে সবসময়ই একটি দ্বিপদী কাব্য বের করে আনতে পারতেন যেটা রহস্যজনকভাবে যথাযথ ছিল প্রত্যেক অসুস্থতা, প্রত্যেক ঘটনা, প্রত্যেক মেজাজ এবং প্রত্যেক রাজনৈতিক আবহাওয়ার সূক্ষ পরিবর্তনের জন্য। তার এই অভ্যাসটি তার আশেপাশের জীবনকে অনেক বেশি প্রগাঢ় করে তুলত এবং সেই একই সময়ে জীবনের স্বতন্ত্রতাকে কমিয়ে দিত। এটা সবকিছুর মধ্যে একপ্রকার ঔদাসীন্যতার বোধ ঢুকিয়ে দিত, একটা বোধ যে যা কিছু ঘটেছে তা সব ঘটে গেছে আরো আগেই। যে সেগুলো ইতোমধ্যেই লেখা হয়ে গেছে, গাওয়া হয়ে গেছে, তাদের নিয়ে মন্তব্য করা হয়ে গেছে এবং তাদের প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছে ইতিহাসের সংগ্রহশালায়। যে নতুন কোন কিছু নেই যা সম্ভব। এটা একটা কারণ হতে পারে যে কেন তার আশপাশের কমবয়সীরা প্রায়ই পালিয়ে যেত, হি হি করে হাসতে হাসতে, যখন তারা বুঝত যে একটি দ্বিপদী কাব্য এখন সমাগত।

যখন জাহানারা বেগম তাকে আফতাবের ব্যাপারে বললেন, সম্ভবত জীবনে প্রথমবারের মত মুলাকাত আলির কাছে পরিস্থিতির উপযুক্ত কোন দ্বিপদী কবিতা ছিল না। প্রাথমিক ধাক্কাটি সামলে নিতে তার কিছুক্ষণ সময় লাগল। সামলে নেয়ার পর, আগে তাকে না জানানোর জন্য তিনি স্ত্রীকে খুব বকা দিলেন। সময় বদলে গেছে, তিনি বললেন। এটা আধুনিক জামানা। তিনি নিশ্চিত ছিলেন তাদের পুত্রের সমস্যাটির জন্য কোন সরল বৈজ্ঞানিক সমাধান আছে। তারা নয়া দিল্লিতে এখন ডাক্তার খুঁজে বের করবেন, পুরাতন শহরের এই মহল্লায় যে ফিসফাস আর গুজব চলে তার থেকে বহুদূরে। সর্বশক্তিমান তাদেরকেই সহায়তা করে যারা নিজেদের সাহায্য করে, তিনি স্ত্রীকে জানালেন একটু কড়া ভাবে।

এক সপ্তাহ পর, তাদের সবচেয়ে ভালো কাপড়গুলো গায়ে দিয়ে, একটি লৌহ-ধূসর পাঠান স্যুট আর কাল এমব্রোয়ডারী করা ওয়েস্ট-কোট, একটা নামাযের টুপি, আর ভেনিসের নৌকার মত বাঁকানো জুতা পরিহিতো এক বিমর্ষ আফতাবকে সঙ্গে নিয়ে, তারা একটি ঘোড়ায় টানা টাঙ্গায় চড়ে রওয়ানা দিলেন নিজামুদ্দিন বস্তির উদ্দেশ্য। তাদের এই বেড়াতে যাওয়ার লোকদেখানো কারণটি ছিল যে তারা একজন সম্ভাব্য কনের পরিদর্শনে চলেছেন তাদের ভাতিজা আজিজের বিয়ের জন্য-সর্বকনিষ্ঠ পুত্র মুলাকাত আলির বড় ভাই কাশেমের, যিনি দেশভাগের পর পাকিস্তান চলে গেছেন এবং বর্তমানে রূহ আফজার করাচি শাখায় কর্মরত। আসল কারণটি হল যে তাদের একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল জনৈক ডাক্তার গুলাম নবীর সাথে, যিনি নিজের পরিচয় দিতেন একজন ‘যৌনবিশেষজ্ঞ’।

ডক্টর নাবির নিজের ব্যাপারে অহংকার ছিল যে তিনি একজন সূক্ষ ও বৈজ্ঞানিক মেজাজ সম্পন্ন স্পষ্ট-কথার লোক। আফতাবকে ভালোমত দেখে টেখে তিনি বললেন আফতাব আসলে ঠিক, চিকিৎবিজ্ঞানের ভাষায়, হিজড়া নয়- মানে পুরুষের শরীরে বন্দী হয়ে পড়া একজন নারী না-যদিও ব্যবহারিক উদ্দেশ্য এই শব্দটি ব্যবহার করা যেতে পারে, তিনি বললেন, সে হল উভয়লিঙ্গের এক বিরল উদাহরণ, যার নারী এবং পুরুষ দুটো বৈশিষ্ট্যই আছে, যদিও বাহ্যিকভাবে, পৌরষিক বৈশিষ্ট্যগুলোকেই দেখা যাচ্ছে বেশি প্রকট। তিনি জানালেন তিনি একজন সার্জনের নাম দিতে পারেন যিনি নারী-অঙ্গটা বন্ধ করে ফেলবেন, সেলাই দিয়ে দিবেন ওটাকে। তিনি কিছু ঔষধপত্রও লিখে দিবেন। কিন্তু, তিনি বলে দিলেন, সমস্যাটি শুধুমাত্র বাহ্যিক নয়। চিকিৎসা যেথায় নিশ্চিতভাবেই সাহায্য করবে, কিছু ‘হিজড়াসুলভ প্রবণতা’ থেকেই যাবে যেগুলো কখনই চলে যাওয়ার কথা না। (প্রবণতার জন্য তিনি ফিতরাত শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন)। পুরোপুরি সফলতার ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত করতে পারবেন না। মুলাকাত আলি, খড়কুটো আঁকড়ে ধরতেও প্রস্তুত, অনুপ্রাণিত হলেন। ‘প্রবণতা?’ তিনি বললেন। “প্রবণতা কোন সমস্যা না। সবারই থাকে কিছু না কিছু প্রবণতা…..প্রবণতা সবসময়ই ঠিক করে ফেলা যায়।”

এখন, ডক্টর াবীর কাছে যাওয়াটা, মুলাকাত আলির বিচারে আফতাবের যেটা দুর্ভোগ, তার কোন তাৎক্ষণিক সমাধান না দিলেও, মুলাকাত আলির এখানে বেশ ভালো পরিমাণ একটা উপকার করল বটে। তিনি দিক নির্দেশনা পেলেন নিজের একটি অবস্থান নির্দিষ্ট করার জন্য, নিজের জাহাজটিকে স্থির করার জন্য যেটা একটি দ্বিপদী কাব্যশূণ্য দুর্বোধ্যতার মহাসমুদ্রে বিপদজনকভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এখন তিনি তার মনোকষ্টকে একটি বাস্তব সমস্যায় পাল্টে নিতে পারবেন আর তার শক্তি আর মনোযোগকে এমন কিছুর দিকে নিতে পারবেন যা তিনি ভালো বোঝেন: কিভাবে সার্জারির জন্য টাকা ওঠানো যায়?

তিনি গৃহস্থালী খরচ কমিয়ে আনলেন এবং টাকা ধার করা যেতে পারে এমন লোকজন এবং আত্মীয়দের একটি তালিকা এঁকে ফেললেন। একই সাথে, তিনি আফতাবের অন্তরে পৌরষিকতা প্রবেশ করানোর সাংস্কৃতিক প্রকল্পটিও হাতে নিলেন। তিনি তার ভিতর নিজের কাব্যপ্রেমটি ছড়িয়ে দিলেন এবং তার ঠুমরী আর চৈতী গাওয়াকে নিরুৎসাহিতো করলেন। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতেন তিনি, গল্প বলতেন আফতাবকে তাদের যোদ্ধা পূর্বপুরুষদের এবং যুদ্ধের ময়দানে তাদের শৌর্যবীর্যের। আফতাবের ওপর এগুলো কোন প্রভাব ফেলত না। কিন্তু যখন সে ওই গল্পটা শুনল যে কিভাবে তেমুজিন-চেঙ্গিজ খান-জিতে নিয়েছিলেন তার সুন্দরী স্ত্রী বোর্তে খাতুনকে, কিভাবে সেই মহিলাকে লুন্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছিল একটি শত্রু গোষ্ঠী আর কিভাবে তেমুজিন বলতে গেলে একদম একাই একটা পুরো সৈন্য বাহিনীর সাথে লড়াই করেছিল কারণ এত ভালোবাসতেন তিনি তাকে, আফতাব নিজেকে খেয়াল করল সে বোর্তে খাতুন হতে চাচ্ছে।

তার ভাই আর বোনারা যখন স্কুলে যেত, আফতাব তার বাসার ছোট বারান্দায় ঘন্টা পর ঘন্টা কাটিয়ে দিত নিচে ‘চিতলী কবরের’ দিকে তাকিয়ে- লোকের কথিত অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন, গায়ে ফোটাফোটা দাগওয়ালা ছোট্ট দর্গাটি -আর তার পাশ দিয়ে যে ব্যস্ত রাস্তাটি বয়ে গেছে এবং গিয়ে যুক্ত হয়েছে মাতিয়া মহল চকের সাথে। সে দ্রুতই এই প্রতিবেশী এলাকাটির তাল আর লয়টি শিখে ফেলল, যেটা ছিল মূলত উর্দু খিস্তির একটি বিরতিহীন স্রোত- তোর মারে চুদি, তোর বোনরে গিয়া চোদ, তোর মায়ের ভোদার কসম-যেটাতে ভাটা পড়ত দিনে পাঁচবার জামা মসজিদ এবং পুরাতন শহরের অন্যান্য ছোট ছোট মসজিদগুলো থেকে নামাজের আযান ভেসে আসার সময়। যখন আফতাব দিনের পর দিন কঠোর নজর রাখত, তেমন বিশেষ কোন কিছুর উপর নয়, গুড্ডু ভাই, সাত-সকালের মাছওয়ালাটি যে তার ঝিকমিকে তাজা মাছের ঠেলাগাড়িটা চকের একদম মাঝখানে রাখত, ঠিকই, যেমন অবশ্যই সূর্য পূর্ব দিকে উঠে আর অস্ত যায় পশ্চিমে, প্রসারিত হয়ে পরিণত হতো ওয়াসিমে, সেই লম্বা, অমায়িক দুপুরবেলার নান খাটাই- বেচা লোকটা যে তারপর সংকুচিত হয়ে ইউনুস হয়ে যেত, সেই ছোট, শীর্ণ, সন্ধ্যাবেলার ফল বিক্রেতা, যিনি, বেশ রাত হলে, প্রশস্ত হয়ে আর ফুলে হাসান মিয়া হয়ে যেতেন, মতিয়া মহলের শ্রেষ্ঠ খাসীর বিরিয়ানীর সেই গাট্টাগোট্টা দোকানদারটি, যে তামার এক বিশাল হাড়ি থেকে বিরিয়ানী বেড়ে দিত। এক বসন্তের সকালে আফতাব একটা লম্বা, সরু-নিতম্বের, খুব উগ্র লিপস্টিক দেয়া, সোনালী হাই-হিল আর ঝলমলে সবুজ সাটিনের সালওয়ার কামিজ পরা মহিলাকে দেখল চুড়ি কিনতে, মীর যিনি চুড়ি বেচতেন তার কাছ থেকে, যে আবার একই সাথে চিতলী-কবরের দেখভালকারীও ছিলেন। প্রতি রাতে সে তার চুড়িগুলো মাজারের ভিতরে রাখত দর্গা আর দোকান বন্ধ করার আগেই। (তিনি এটুকু নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে কর্মঘন্টাগুলো একে অন্যের সাথে মিলে যাবে।) লম্বা লিপস্টিক দেয়া মহিলাটির মত কাউকে কোনদিন দেখেনি আফতাব। খাড়া খাড়া সিঁড়িগুলো দিয়ে দৌড়ে সে দ্রুত রাস্তায় নামল আর তাকে চুপিচুপি অনুসরণ করতে লাগল যতক্ষণে মহিলা খাসির পায়া কিনল, চুলের ক্লিপ, পেয়ারা কিনল আর নিজের স্যান্ডেলের ফিতাটা ঠিক করল।

হি ওয়ান্টেড টুবি হা’র। আফতাব ওই মহিলাটির মতো হতে চায়।

আফতাব সমস্ত রাস্তা ধরে তাকে অনুসরণ করে একেবারে টার্কম্যান গেট পর্যন্ত আসল আর দাঁড়িয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ নীল দরজাটার সামনে যার পেছনে তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। শাহজাহানবাদের রাস্তায় কোন সাধারণ মহিলাকে এরকম সাজগোজ করে অবলীলায় চলাফেরা করতে করার কথা না। শাহজাহানবাদে সাধারণ মহিলারা বোরখা পরত বা অন্তত তাদের হাতের তালু আর পায়ের পাতা ব্যতীত নিজেদের মাথা আর সমস্ত শরীর ঢাকত। আফতাব যে মহিলাটির পিছু নিয়েছিল সে সেজেগুজে এভাবে হাঁটতে পেরেছিল কারণ সে মহিলা নয়। সে যাই হোক না কেন, আফতাব ওই মহিলাটির মতো হতে চেয়েছিল। আফতাব যতটা না বোর্তে খাতুন হতে চেয়েছিল তার চেয়েও বেশি হতে চেয়েছিল ওই ‘মহিলাটি’। সে তার মত ঝিকমিকিয়ে চলে যেতে চেয়েছিল মাংসের দোকানগুলোর পাশ দিয়ে যেখানে চামড়া ছাড়ানো ছাগলের আস্ত আস্ত তাজা দেহগুলো ঝুলে রয়েছে মাংসের মহাপ্রাচীরের মত; সে অকারণে হাসতে হাসতে নিউ লাইফস্টাইল মেন’স হেয়ার ড্রেসিং সেলুনের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে চেয়েছিল যেখানে ইলিয়াস নাপিতটা লিয়াকাত নামের সুঠাম কমবয়সী কসাইটার চুল কাটে আর ব্রায়ালক্রিম দিয়ে চকচকে করে তোলে। সে চেয়েছিল নখে রঙ করা আর কব্জি ভর্তি চুড়িওয়ালা একটা হাত মেলে ধরতে আর দরদাম করে দাম কমানোর আগে আলতো করে একটা মাছের কানকা উঠিয়ে দেখতে যে মাছটা কতটুকু তাজা। রাস্তার জমাট জলের ওখান দিয়ে পা ফেলার আগে সে চেয়েছিল তার সালোয়ার কামিজটা অল্প করে উঠিয়ে নিতে-সামান্য যতটুকুতে তা’র পায়ের রুপালী নুপুরগুলো দেখানো যায়।

আফতাবের নারী-অঙ্গটি যে সেটা শুধুই একটি উপাঙ্গ মাত্র ছিল, এমন নয়।

গানের ক্লাস আর লম্বা মহিলাটা গলি ডাকোতানের যেই বাসায় থাকত সেটার নীল দরজাটির বাইরে ঘোরাঘুরির মধ্যে আফতাব তার সময়কে ভাগ করতে শুরু করল। সে জানতে পারল যে মহিলাটির নাম ছিল বোম্বে সিল্ক এবং তার মত আরও সাতজন ওখানে আছে- বুলবুল, রাজিয়া, হীরা, বেবি, নিম্মো, ম্যারি, আর গুড়িয়া, যারা একসাথে থাকত নীল দরজাওয়ালা সেই হাভেলিতে, আর তাদের ছিল একজন উস্তাদ, একজন গুরু, নাম ছিল যার কুলসুম বাঈ, তাদের অন্য সবার থেকে বয়সে বড়, যে ছিল সেই গৃহস্থালীটির প্রধান। আফতাব জেনেছিল তাদের বাড়িটার নাম খোয়াবগা- স্বপ্নের বাড়ি।

প্রথমদিকে তাকে তাড়িয়ে দূর করে দেয়া হতো কারণ সবাই, যার মধ্যে রয়েছেন খোয়াবগার বাসিন্দারাও, মুলাকাত আলিকে চিনত আর তার বিরাগভাজন হওয়ার কোন ইচ্ছা তাদের ছিল না। কিন্তু কিছু যায় আসত না যত হুঁশীয়ারী আর শাস্তিই অপেক্ষা করুক তার জন্যে, আফতাব একগুঁয়ের মত তার জায়গাটিতে ফিরে আসত, দিনের পর দিন। তার জগতে এটাই ছিল একমাত্র জায়গা যেখানে তার এমন লাগত যে বাতাস তার জন্য জায়গা করে দিচ্ছে। যখন সে আসত, বাতাসটা মনে হতো সরে গেল, একদিকে চেপে গেল, যেন একটা স্কুলের বন্ধু ক্লাসরুমের বেঞ্চে তার বসার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। কয়েকমাসের একটি সময়কাল পরে, টুকটাক কাজ করে দিয়ে, তাদের ব্যাগ আর বাদ্যযন্ত্র বহন করে যখন বাসিন্দারা তাদের শহর পরিভ্রমণে বেরোত। শেষ পর্যন্ত আফতাব একটা কর্মময় দিনের শেষে তাদের পাগুলো মালিশ করে দিয়ে খোয়াবগার অভ্যন্তরে নিজের প্রবেশাধিকার অর্জন করতে পারল। অবশেষে সেই দিন আসল যখন তাকে ভিতরে যেতে দেয়া হল। সে অতিসাধারণ, ভেঙে-পড়া সেই বাড়িটাতে ঢুকল যেন সে স্বর্গের দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে।

নীল দরজাটা খুললে উঁচু দেয়ালঘেরা ইট বসানো একটা উঠান। যার এক কোনায় একটা চাপকল আরেক কোনায় একটা ডালিম গাছ। লম্বা লম্বা খাঁজ কাটা কলামের একটা গভীর বারান্দার পেছনে দুটো ঘর ওঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে একটা ঘরের ছাদ ধসে গিয়েছে আর দেয়াল ভেঙে গুড়িয়ে ইট পাথরের একটা স্তুপে পরিণত হয়েছে যেখানে একটা বিড়ালের পরিবার নিজেদের সংসার পেতেছে। যে ঘরটা লুটিয়ে পড়েনি সেটা বেশ বড়, এবং ভালো অবস্থাতেই ছিল। ঘরটির চুনকাম উঠতে থাকা, হালকা সবুজ বর্ণের দেয়ালগুলোর গায়ে সারিবদ্ধ ভাবে লেগে ছিল চারটি কাঠের এবং দুটো গোদরেজের আলমারি যেগুলো ঢাকা পড়েছিল ফিল্ম তারকাদের ছবি দিয়ে-মধুবালা, ওয়াহিদা রেহমান, নার্গিস, দিলীপ কুমার (আসলে যার নাম ছিল মুহাম্মাদ ইউসুফ খান), গুরু দত্ত, আর স্থানীয় যুবক জনি ওয়াকার (বদরুদ্দিন জামালুদ্দিন কাজী), যেই কৌতুকাভিনেতা পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী লোকটিকেও হাসাতে পারেন। আরেকটা আলমারির দরজার উপর লাগানো ছিল একটা ম্লান, পূর্ণ-দৈর্ঘ্য আয়না। আরেক কোনায় ছিল একটা বহুল ব্যবহৃত পুরাতন ড্রেসিং টেবিল। উপরের উঁচু ছাদ থেকে ঝুলছিল একটা কোনাওঠা ভাঙা ঝাড়বাতি যার একটামাত্র বাল্ব কাজ করছিল, আর একটা লম্বা-রডের গোড়ায় একটা গাঢ় বাদামী ফ্যান। ফ্যানটির কিছু মানবীয় গুণাবলী ছিল-সে ছিল লাজুক, মেজাজী এবং যার হাবভাব বোঝা দায়। তার একটা নামও ছিল, উষা। উষা এখন ঠিক আর যুবতীটি নেই, আর বেশিরভাগ সময় তাকে মিষ্টি কথা দিয়ে ভুলাতে হতো আর লম্বাহাতলের একটা ঝাড়ু দিয়ে ঠেলা দিতে হতো এবং তারপরই সে কাজে যেত, একটা গতিহীন পোল-নর্তকীর মত চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে। হাভেলির একমাত্র বিছানাটিতে ওস্তাদ কুলসুম বাঈ ঘুমাত। সাথে থাকত তার টিয়াপাখি বিরবল, তার মাথার উপরের ঝুলন্ত খাচায়। রাতে কুলসুম বাঈ তার কাছে না থাকলে বিরবল এমনভাবে চিৎকার করত যেন তাকে জবাই করে ফেলা হচ্ছে। তার জাগ্রত ঘন্টাগুলোতে বিরবল কিছু অস্ত্র-প্রমাণ গালিগালাজে পারদর্শী ছিল যাদের শুরুটা হতো সবসময়ই অর্ধ-বিদ্রুপ আর অর্ধ-প্রণয়কৌতুকমিশ্রিত সেই আই-হাই! দিয়ে, যেটা সে শিখেছিল তার অন্যান্য গৃহসংগীদের কাছে থেকে। বিরবলের সবচেয়ে পছন্দের গালিটি ছিল যেটা প্রায়ই শোনা যেত খোয়াবগায়: সালি রান্ডি হিজরা (বাইনচোদ হিজরা মাগী)। বিরবল সবকটা রুপাভেদ জানত। এটা সে বিড়বিড় করতে পারত, বলতে পারত সামান্য প্রেম-প্রেম ভাব নিয়ে, ঠাট্টা করে, আদর করে, আর প্রকৃত তিক্ত ক্রোধ সহকারে।

অন্য সবাই ঘুমাত বারান্দায়, তাদের বিছানাপত্র দিনের বেলায় গুটানো থাকতো বিশাল বিশাল কোলবালিশের মত। শীতের দিনে, যখন উঠানটা ঠান্ডা আর স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যেত, সবাই মিলে তখন ভীড় করত কুলসুম বাঈয়ের ঘরে। টয়লেটে যাওয়ার রাস্তাটি ছিল লুটিয়ে পড়া ঘরটির ধ্বংসস্তুপের মধ্য দিয়ে। চাপকলটিতে গোসলের জন্য সবাই পালাবদল করত। একটা আজব ধরনের খাড়া, সরু সিঁড়ি গিয়ে উঠেছিল প্রথমতলার রান্নাঘরটিতে। রান্নাঘরের জানালাটি দিয়ে হলি ট্রিনিটি চার্চের গম্বুজ দেখা যেত।

ম্যারি ছিল খোয়াবগার বাসিন্দাদের মধ্যে একমাত্র ক্রিশ্চান। সে গির্জায় যেত না, কিন্তু গলায় একটা ছোট ক্রুশ ঝোলাত। গুড়িয়া আর বুলবুল দুজনেই ছিল হিন্দু আর মাঝে মাঝে যেসব মন্দিরে তাদের ঢুকতে দেওয়া হতো সেগুলোতে তারা যেত। বাকীরা ছিল মুসলিম। তারা জামা মসজিদে যেত, আর সেসব দর্গায় যেত যেগুলো তাদের অনুমতি দিত ভেতরের কক্ষগুলোতে যাওয়ার (কারণ জীববিজ্ঞানের বিচারে যারা নারী তাদের মত, হিজরাদেরকে অপবিত্র বিবেচনা করা হতো না যেহেতু তাদের রজঃক্রিয়া নেই)। খোয়াবগার সবচেয়ে পৌরষিক ব্যক্তিটি অবশ্য, রজস্বলা ছিলেন বটে। বিসমিল্লা ওপরতলায় রান্নাঘরের মেঝেতে ঘুমাতেন। সে ছিল একজন ছোটখাট, পাকানো শরীরের, কৃষ্ণগাত্রের রমণী যার বাসের হর্ণের মত বিকট গলার আওয়াজ ছিল। তিনি ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং খোয়াবগায় এসে উঠেছিলেন কয়েক বছর আগে (এই ঘটনাদ্বয়ের মাঝে কোন সংযোগ নেই), যখন তার স্বামী, দিল্লি ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের একজন বাস ড্রাইভার, তাকে তাদের ঘর থেকে বের করে দিয়েছিলেন কোন সন্তান তাকে জন্ম দিতে না পারার জন্য। অবশ্যই তার এটা কোনদিনই মাথায় আসেনি যে তাদের সন্তানহীনতার জন্য সে নিজেও একইভাবে দায়ী থাকতে পারে। বিসমিল্লা (পূর্বে বিমলা) রান্নাঘরটা দেখতেন আর একজন শিকাগোর পেশাদার গুন্ডার হিংস্রতা আর ক্রুরতা নিয়ে খোয়াবগাকে পাহারা দিতেন বাইরের অনাকাক্সিক্ষত অনুপ্রবেশকারীদের থেকে। তার প্রকাশ্য অনুমতি ব্যতীত কমবয়সী ছেলেদের খোয়াবগাতে প্রবেশ করা কঠোরভাবে নিষেধ ছিল। এমনকি নিয়মিত খদ্দেরদেরকেও, যেমন আঞ্জুমের ভবিষ্যত অতিথি-ইংলিশ জানত যে লোকটা-ভেতরে ঢুকতে দেয়া হতো না এবং তাদেরকে নিজেদের অন্য ব্যবস্থা করে নিতে হতো সাক্ষাতের জন্য। রান্নাঘরের চত্বরে বিমলার সাথী ছিল রাজিয়া, যার বিচারবুদ্ধির বিনাশ ঘটেছিল আর একই সাথে স্মৃতিবিলুপ্তিও, এখন আর সে জানত না সে কে ছিল অথবা কোথা থেকে সে আসল। রাজিয়া আসলে হিজরা ছিল না। সে ছিল একজন পুরুষ যে মেয়েদের কাপড় পরে সাজতে পছন্দ করত। তবে, সে আবার চাইত না যে তাকে মহিলা ভাবা হোক, বরং সে একজন পুরুষ যে মহিলা হতে চায়। লোকজনের কাছে (যার মধ্যে হিজড়ারাও আছেন) পার্থক্যটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টাটি সে বহু আগেই বন্ধ করে দিয়েছে। রাজিয়া তার দিন কাটাত ছাদের কবুতরদের খাইয়ে আর সকল আলোচনার মোড় গোপন, অব্যবহৃত সরকারি চক্রান্তের (দাও-পেচ, সে বলত সেটাকে) দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে যেটা সে আবিষ্কার করেছে হিজড়া আর তার মত মানুষদেরকে নিয়ে। চক্রান্তটি অনুসারে, তারা সবাই একসাথে থাকবে একটা আবাসন প্রকল্পের মত কলোনিতে আর তাদেরকে সরকারি ভাতা দেয়া হবে এবং জীবিকা রোজগারের জন্য তাদেরকে আর যেটা রাজিয়ার বর্ণনায়-বেত্তমিযি-আজেবাজে আচরণ-সেটা করতে হবে না। রাজিয়ার অন্য আলোচ্য বস্তুটি ছিল রাস্তার বিড়ালদের জন্য সরকারি ভাতা নিয়ে। কোন এক কারণে তার স্মৃতিহীন, বাঁধনহীন মনটা সবসময় অভ্রান্তভাবে সরকারি চক্রান্তের দিকে নিজেকে ঘুরিয়ে নিত।

খোয়াবগাতে আফতাবের প্রথম প্রকৃত বন্ধুটি ছিল নিম্মো গোরাখপুরী, তাদের সবার মধ্যে সে ছিল কমবয়সী এবং একমাত্র ব্যক্তি যে হাইস্কুল শেষ করেছে। নিম্মো পালিয়ে এসেছে তার গোরাখপুরের বাড়ি থেকে যেখানে তার বাবা জ্যেষ্ঠ-বিভাগীয়-কেরানী হিসেবে কাজ করত প্রধান ডাক অধিদপ্তরে। যদিও সে বেশি বয়স্ক হওয়ার একটা ভাব ধরত, আসলে নিম্মো আফতাবের চেয়ে মাত্র ছয় কি সাত বছরের বড় ছিল। সে ছিল বেঁটে আর গোলগাল, সাথে ঘন কোকড়ানো চুল, পুরাতন তুর্কী তলোয়ারের মত বাঁকানো মারাত্মক একজোড়া ভুরু, আর অসামান্য রকমের ঘন আঁখিপল্লব। সে হয়তো সুন্দরী হতো, কিন্তু সমস্যা ছিল তার মুখমণ্ডলের দ্রুত বর্ধনশীল কেশমালা, যার কারণে মেকআপের নিচে তার গালের চামড়াগুলোকে নীল দেখাত, এমনকী সে শেভ করার পরেও। পশ্চিমা নারীদের ফ্যাশন নিয়ে নিম্মোর আগ্রহটি ছিল আচ্ছন্নতার পর্যায়ে এবং সে হিংস্রভাবে রক্ষণমূলক ছিল নিজের ফ্যাশন ম্যাগাজিনের সংগ্রহটির ব্যাপারে। যেগুলোর যোগাড় হয়েছিল খোয়াবগা থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে দারিয়াগঞ্জের রাস্তার উপর রবিবারের পুরাতন বই বাজার থেকে। বইবিক্রেতাদের একজন নওশাদ, যে দূতাবাস এলাকা শান্তিপথের দূতাবাসগুলোর বর্জ্য সংগ্রাহকদের কাছ থেকে পুরোনো ফেলে দেওয়া ম্যাগাজিনগুলো কিনত, সেগুলোকে একপাশে আলাদা করে রাখত, আর নিম্মোর কাছে বেচত ব্যাপক মূল্যহ্রাসে।

“তুমি জান কেন ঈশ্বর হিজড়াদের বানালেন?” সে আফতাবকে জিজ্ঞেস করল একদিন দুপুরে কোনা ছিঁড়ে যাওয়া একটা ভোগ ম্যাগাজিনের ১৯৬৭ সালের সংখ্যার পাতা উল্টাতে উল্টাতে, সামান্য থেমে গিয়ে উন্মোচিত ফর্সা ফর্সা পা-ওয়ালা ব্লন্ড মেয়েগুলোর উপর যারা তাকে খুব মুগ্ধ করত।

“না, কেন?”

“এটা একটা পরীক্ষা ছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এমন কিছু একটা সৃষ্টি করার, একটা জীবিত প্রাণী, যেটার সুখী হওয়ার ক্ষমতা নেই। তাই, তিনি আমাদের বানালেন।”

শরীরে চাবুকের আঘাতের তীব্রতা নিয়ে তার কথাগুলো আফতাবকে আক্রমণ করল। ‘এটা তুমি কিভাবে বললে? এখানে তোমরা সবাই সুখে আছো! এটা হচ্ছে সেই স্বপ্নের বাড়ি!’ উৎকন্ঠা নিয়ে সে জিজ্ঞেস করল।

“কে সুখী এখানে? সবটাই ছলনা আর অভিনয়,” নিম্মো স্বল্পবাক্যে বলল, ম্যাগাজিনের পাতা থেকে চোখ তোলারও প্রয়োজন বোধ করল না। “কেউ এখানে সুখী না। সেটা সম্ভবই না। আরে ইয়ার, চিন্তা করে দেখো, কোন জিনিসগুলো নিয়ে তোমরা সাধারণ লোকেরা অসুখী হও? মানে আমি তোমার কথা বলছি না, কিন্তু তোমার মত বয়সীদের- কি তাদেরকে অসুখী করে? জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধি, বাচ্চাদের স্কুলে-ভর্তি, স্বামীর মারধোর, বউয়ের ধোঁকা, হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ-বাইরের জিনিসপত্র যেগুলো ঠিক হয়ে যায় একটা সময়ে। কিন্তু আমাদের জন্য মূল্য বৃদ্ধি, স্কুলে-ভর্তি, মারধোর করা স্বামী আর ধোঁকা দেয়া বউ-সবটাই আমাদের ভিতরে। দাঙ্গাটা আমাদের ভিতের। যুদ্ধটা আমাদের ভিতরে। ভারত-পাকিস্তান আমাদের ভিতরে। এটা কোনদিনই ঠিক হবে না। হতে পারে না।”

আফতাব ব্যাকুলভাবে তাকে ভুল প্রমাণ করতে চাইল, তাকে বলতে চাইল যে সে মারাত্মক ভুল বলেছে, কারণ সে এখন সুখী, যতটা না সুখী সে আগে কোনদিন ছিল। সে জীবন্ত প্রমাণ ছিল যে নিম্মো গোরাখপুরীর কথা ভুল। কিন্তু সে কথাটা বলল না, কারণ সেটার মধ্যে তার নিজের বিষয়টাও চলে আসবে যে সে একজন ‘সাধারণ মানুষ’ না, যা প্রকাশ করতে এখনও সে প্রস্তুত নয়।

 যখন আফতাবের বয়স চোদ্দ হল, সে-সময় নিম্মো খোয়াবগা থেকে পালিয়ে যায় একজন স্টেট ট্রান্সপোর্ট বাসের ড্রাইভারের হাত ধরে (যে কিছুদিন পরেই নিম্মোকে ছেড়ে দিয়ে নিজের পরিবারের কাছে ফেরত যায়), আফতাব বুঝতে পারল নিম্মো ঠিক কি বুঝিয়েছিল তখন। আফতাবের শরীর হঠাৎ করেই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে । সে হয়ে উঠল লম্বা আর পেশীবহুল। এবং লোমশ। অতি আতঙ্কবশত সে তার চেহারা আর শরীরের লোমগুলো উঠানোর চেষ্টা করল বার্নোল দিয়ে-একটা ফোস্কার মলম, যেটা তার চামড়ার উপর কাল কাল দাগ ফেলে দিল। এরপর সে ব্যবহার করে দেখল অ্যান্নে ফ্রেঞ্চ ক্রীম হেয়ার রিমুভার- যেটা সে তার বোনদের কাছ থেকে চুরি করেছিল (সে দ্রুতই ধরা পড়ে গিয়েছিল কারণ সেটার গন্ধটা ছিল একটা খোলা নর্দমার মত)। সে তার ঝোপের মত ঘন ভুরুর লোমগুলোকে উপড়ে দুটো সরু চন্দ্রে পরিণত করেছিল বাসায় বানানো একজোড়া সন্না দিয়ে, যেগুলো দেখতে লাগত সাড়াশির মত। ধীরে ধীরে তার একটা কন্ঠমণি দেখা দিল যেটা দ্রুত ওপর নিচে ওঠানামা করত। তার ইচ্ছা করত গলা থেকে ওটাকে ছিড়ে বের করে ফেলতে। সবচেয়ে নিষ্ঠুর বিশ্বাসঘাতকতাটি এল এরপর-যে জিনিসটার ব্যাপারে তার কিছুই করার ছিল না। তার কন্ঠস্বর ভেঙে গেল। একটা গভীর, শক্তিশালী পুরুষের গলার স্বর দেখা দিল তার মিষ্টি, চিকন কন্ঠের জায়গায়। তার ঘেন্না হতো সেটাকে এবং নিজের কাছে ভয় লাগত যখনই সে কথা বলত। সে চুপচাপ হয়ে গেল, আর কথা বলত একমাত্র একটা শেষ সম্বল হিসেবে, যখন তার হাতে আর কোন উপায় নেই। যখন সে গান শুনত, মনোযোগ দিচ্ছে এমন যে কেউ খেয়াল করত একটা চিকন, প্রায় শোনাই যায় না, পোকার-মত গুনগুন শব্দ যেটা মনে হতো যে তার মাথার উপরের কোন সুক্ষ-ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসছে। এমন কোন প্রকার যুক্তি উপদেশ ছিল না, এমন কি খোদ উস্তাদ হামিদ খানের কাছ থেকেও, যে ভুলিয়ে ভালিয়ে একটা গান বের করতে পারবে আফতাবের থেকে। সে আর কোনদিন গান গায় নি, একমাত্র পার্থক্য যখন সে হিন্দী ফিল্মের গান নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করত হিজড়াদের অশ্লীল আড্ডাগুলোতে অথবা যখন (তাদের পেশাগত কারণে) তারা আবির্ভুত হতো সাধারণ লোকদের উৎসবগুলোতে-বিয়ে, জন্ম, গৃহপ্রবেশের অনুষ্ঠানগুলোতে-নাচতে নাচতে, তাদের বণ্য, খসখসে কন্ঠে গাইতে গাইতে, নিজেদের আশীর্বাদ নিবেদন করত আর হুমকি দিত গৃহকর্তাকে লজ্জিত করার (তাদের বিকৃত গোপনাঙ্গগুলো অতিথিদের সামনে উন্মোচিত করার মাধ্যমে) আর উপলক্ষ্যটিকে নষ্ট করে দিত খিস্তিখেউড় করে আর অচিন্তনীয় অশ্লীলতার প্রদর্শন করে যদি না তাদেরকে একটা ভালো সম্মানী দেয়া হতো।(এটার কথাই রাজিয়া বুঝিয়েছিল যখন সে বলেছিল বেত্তমিযি আর যেটা নিম্মো গোরাখপুরী বুঝিয়েছিল যখন সে বলেছিল, “আমরা হায়েনা যারা অন্য মানুষদের সুখের উপর খাওয়াদাওয়া করে বেঁচে থাকি, আমরা সুখ-শিকারী।” তার ব্যবহৃত শব্দমালাটি ছিল খুশি-খোড়।)

একবার যখন সংগীত আফতাবের সঙ্গ ত্যাগ করল তার কাছে আর কোন কারণ রইল না সেখানে বাস করতে থাকার যেটাকে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ মনে করত বাস্তব জগত-হিজড়ারা বলত যেটাকে দুনিয়া, বিশ্ব। একরাতে সে কিছু টাকা আর তার বোনদের ভালো কাপড়গুলো চুরি করল আর থাকতে চলে আসল খোয়াবগায়। জাহানারা বেগম, কখনই তার লাজুকতার জন্য পরিচিত ছিলেন না, আফতাবকে ফিরে পাওয়ার জন্য রীতিমত হামলা করে খোয়াবগায় ঢুকে পড়লেন। আফতাব তাঁর সাথে চলে আসতে রাজি হল না। তিনি অবশেষে ফিরে গেলেন ওস্তাদ কুলসুম বাইকে প্রতিজ্ঞা করানোর পর যে অন্তত সপ্তাহান্তে, আফতাবকে সাধারণ ছেলেদের পোশাক পরানো হবে আর বাসায় পাঠানো হবে। ওস্তাদ কুলসুম বাঈ নিজের প্রতিজ্ঞার মান রাখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সেই ব্যবস্থাটি টিকেছিল মাত্র কয়েক মাসের জন্য।

আর তাই, পনেরো বছর বয়সে, সেখান থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে যেখানে তার পরিবার শত শত বছর ধরে বসবাস করেছে, একটা সাধারণ দরজার মধ্য দিয়ে আফতাব পা রাখল আরেকটি ব্রহ্মাণ্ডে। খোয়াবগায়ের একজন স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে তার প্রথম রাতে, সে উঠানের মধ্যে সবার প্রিয় চলচ্চিত্রের পছন্দের গানের সাথে নাচল-মুঘলে আযম থেকে ‘পিয়ার কিয়া তো ডারনা কিয়া’। দ্বিতীয় রাতে একটা ছোট উৎসবে তাকে উপহার দেয়া হল একটা সবুজ খোয়াবগা দোপাট্টা আর দীক্ষিত করা হল নিয়ম-রীতিতে যেটা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে হিজড়া সম্প্রদায়ের একজন সদস্য বানিয়ে দিল। আফতাব হয়ে গেল আঞ্জুম, শিষ্য হলো ওস্তাদ কুলসুম বাঈয়ের যিনি দিল্লি ঘরানার, যেটা দেশের সাতটি আঞ্চলিক হিজড়া ঘরাণার একটি, প্রত্যেকটির নেতৃত্বে একজন নায়ক, একজন অধিপতি, তাদের সবার নেতৃত্বে একজন মহান অধিপতি।

যদিও জাহানারা বেগম ওখানে আর কোনদিন তার কাছে যাননি, বছরের পর বছর তিনি খোয়াবগায় প্রতিদিন একবেলার গরম খাবার পাঠাতে লাগলেন। একমাত্র যেই জায়গাটিতে তিনি আর আঞ্জুম দেখা করতেন সেটা ছিল হযরত শারমাদ শহীদের দর্গা। সেখানে তারা একসাথে বসে থাকতেন কিছুক্ষণের জন্য, আঞ্জুম প্রায় ছয় ফুটের মত লম্বা তখন, তার মাথাটি প্রশান্তভাবে ঢাকা একটা চুমকি বসানো ওড়নায়, আর ক্ষুদ্র জাহানারা বেগম, যার চুল ধূসর হতে শুরু করেছে তার কাল বোরখার নিচে। মাঝেমাঝে, তারা একে অন্যের হাত ধরতেন চুপিচুপি। তার দিক থেকে মুলাকাত আলি এই পরিস্থিতি অতটা মেনে নিতে পারেননি। তার ভগ্নহৃদয় কোনদিই আর জোড়া লাগেনি। যদিও তিনি তার সাক্ষাৎকারগুলো দেয়া চালু রেখেছিলেন, তিনি কখনই ব্যক্তিগতভাবে বা জনসম্মুখে বলতেন না সেই দুর্ভাগ্যের কথা- যেটা চেঙ্গিজ খানের সাম্রাজ্যের উপর পতিত হয়েছে। তিনি তার পুত্রের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করাকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি আর কোনদিন আঞ্জুমের সাথে দেখা করেননি বা তার সাথে কথা বলেননি। হঠাৎ হঠাৎ তারা রাস্তায় একে অন্যকে পাশ কাটিয়ে যেত এবং দৃষ্টি বিনিময় করত, কিন্তু কখনই সম্ভাষণ নয়। কোনদিন নয়।

বছরগুলোর পরিক্রমায় আঞ্জুম হয়ে উঠলেন দিল্লির সবচেয়ে বিখ্যাত হিজড়া। চলচ্চিত্র-নির্মাতারা একে অন্যের সাথে লড়াই করত তাঁর জন্যে, এনজিওরা তাকে সযতেœ লালন করত, বিদেশি প্রতিনিধিরা পেশাগত সহায়তা হিসেবে একে অন্যকে তাঁর ফোন নাম্বার উপহার দিত, যার সাথে আরো থাকত বার্ড হসপিটাল ও ফুলন দেবী, ‘দস্যুরানী’ হিসেবে পরিচিত আত্মসমর্পণকারী সেই ডাকাতের নাম্বার এবং নিজেকে ‘হুদের বেগম’ দাবি করতেন- এমন একজন মহিলার সাথে যোগাযোগের ঠিকানা যিনি রিজ ফরেস্টের একটা পুরাতন ধ্বংসস্তুপের মধ্যে বাস করতেন তার চাকর এবং ঝাড়বাতিগুলো নিয়ে আর তার দাবি আঁকড়ে থাকতেন অস্তিত্বহীন রাজ্যের ব্যাপারে। সাক্ষাতকারে আঞ্জুমকে উৎসাহিত করা হতো সেই অত্যাচার আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে কথা বলার জন্য যেটা তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা ধরেই নিত তিনি মুখোমুখি হয়েছেন তার গতানুগতিক মুসলিম বাবা-মা, ভাইবোন আর প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। তারা সবাই অভিন্নভাবেই মনক্ষুণœ হতো যখন তিনি তাদেরকে জানাতেন কতটা তার বাবা আর মা তাকে ভালোবেসেছে আর কিভাবে তিনিই ছিলেন সেই নিষ্ঠুর মানুষটি। ‘অন্যদের খুব ভয়ঙ্কর সব গল্প আছে, যেমনটা তোমরা লিখতে পছন্দ করো,’ তিনি বলতেন। “তাদের সাথে আলাপ করো না কেন?” কিন্তু অবশ্যই সংবাদপত্রগুলো ওইভাবে কাজ করত না। তিনিই ছিলেন নির্ধারিত জন। সেটা তাঁকেই হতে হবে, এমনকি যদি তার গল্পটি ঈষৎ পরিবর্তনও করা হতো পাঠকের রুচি আর চাহিদার সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য।

একবার যখন সে খোয়াবগায়ের একজন স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেল, অবশেষে সেইসব কাপড়গুলোতে সাজতে পারল যেগুলো পরার শখ তার বহুদিনের-সেই চুমকি বসানো, মাকড়সার জালের মত মিহি সূতায় বোনা কুর্তা আর ভাঁজওয়ালা পাটিয়ালা সালোয়ার কামিজগুলো, ঘাগড়াগুলো, রূপার নুপুর, কাঁচের চূড়ি আর ঝোলানো কানের দুল। সে তার নাকে ফুটো করাল এবং একটা প্রশস্ত পাথর বসানো নাকফুল পরল, খোল আর আইশ্যাডো দিয়ে চোখগুলোকে এঁকে নিল আর নিজের মুখটাকে বানাল একটা চকচকে লাল রঙের লিপিস্টিক দেয়া কামার্ত, ধনুকাকৃতির মধুবালার মত। তার চুল খুব বেশি বড় হতো না, তবে এতটুকু লম্বা হতো যে পিছনের দিকে টানা যেত আর বুনে দেয়া যেত একটা নকল চুলের বেণীর সাথে। তার ছিল একটা শক্তপোক্ত, কাটা কাটা চেহারা আর তার বাবার মত একটা মনোমুগ্ধকর হুকোর মত বাঁকানো নাক। সে সেইভাবে সুন্দর ছিল না যেমন বোম্বে সিল্ক ছিলেন, কিন্তু আরো আবেদময়ী ছিল, আরো উত্তেজক, সুদর্শন- যেইভাবে কিছু মেয়েরা হয়ে থাকেন। এইরকম চেহারা আর সাথে একটা অতিরঞ্জিত, সীমা ছাড়ানো নারীত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে তার একনিষ্ঠ অধ্যবসায়ের কারণে আশপাশের প্রতিবেশী এলাকার আসল, পূর্ণ জৈবিক গুণাবলীসম্পন্না মেয়েদেরকে- এমনকি যারা পুরোটা ঢাকতেন না তাদেরকেও- তাঁর সামনে ধুসরিত আর ছত্রভঙ্গ দেখাত। সে শিখল হাঁটার সময় নিজের নিতম্বের দোলাটিকে একটি অস্থিরতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া আর ভাব বিনিময়ের জন্য ব্যবহার করা আঙুল ছড়ানো চিহ্নিত সেই হিজড়া তালি, যেটা বন্দুকের গুলোর মত বেজে উঠত আর যেকোন অর্থ বোঝাতে পারত-হ্যাঁ, না। হয়তোবা, ওয়াহ! বেহেন কা লওড়া (বাহ! তোর বোনের ল্যাওড়া), ভোসাদিকে (পুটকি দিয়া জন্মানো)। একমাত্র আরেকজন হিজড়াই সংকেতটি ভাঙতে পারবেন যে ওই বিশেষ মুহূর্তে ওই বিশেষ তালিটি দিয়ে কি বিশেষ মানেটা বোঝানো হয়েছে।

আঞ্জুমের আঠারোতম জন্মদিনে কুলসুম বাঈ তার জন্য একটা পার্টি দিলেন খোয়াবগায়। সারা শহর থেকে হিজড়ারা এসে জড়ো হলেন, কেউ কেউ শহরের বাইরে থেকে আসলেন। তার জীবনে প্রথমবারের মত আঞ্জুম শাড়ি পরলেন, একটা লাল ডিসকো শাড়ি, সাথে একটা পিঠখোলা চোলি। সেই রাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন যে নিজের বিয়ের বাসর রাতে তিনি একজন নববধূ। জেগে উঠে তিনি প্রবল মনোকষ্টের সাথে লক্ষ্য করলেন যে তার যৌনসুখ নিজেকে একজন পুরুষের মত করে প্রকাশ করেছে তার চমৎকার নতুন শাড়িতে। এটা প্রথমবার নয় যে এমনটা ঘটেছিল, কিন্তু কোন একটি কারণে, হয়তোবা শাড়িটার জন্যই, তার যে অপমান বোধ হল সেটা আগে কখনও এত প্রবল ছিল না। তিনি উঠানে বসলেন আর নেকড়ের মত হু হু করতে লাগলেন, নিজের মাথায় আর দুই পায়ের মাঝখানে বাড়ি দিতে দিতে, আত্মআঘাতের যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে। ওস্তাদ কলুসুম বাঈ, এ জাতীয় মঞ্চকলার সাথে যিনি যথেষ্ট পরিচিত, আঞ্জুমকে একটা স্নায়ুশীতলকারী ওষুধ খেতে দিলেন আর ঘরে নিয়ে গেলেন।

 আঞ্জুম ঠান্ডা হওয়ার পরে উস্তাদ কুলসুম বাঈ তার সাথে ধীরকন্ঠে এমন একভাবে কথা বললেন যেভাবে তিনি আগে কোনদিন বলেননি। কিছু নিয়েই লজ্জিত হওয়ার কোন কারণ নেই, উস্তাদ কুলসুম বাঈ তাঁকে বললেন, কারণ হিজড়ারা হলো বাছাই করা মানুষ, সর্বশক্তিমানের বিশেষ ভালোবাসার। হিজড়া

শব্দটার, তিনি বললেন, মানে দাঁড়ায় একটা দেহ, যার মধ্যে একটা পবিত্র আত্মা থাকে। পরবর্তী ঘন্টাটিতে আঞ্জুম শিখলেন যে পবিত্র আত্মারা বিভিন্ন রকমের হয় আর খোয়াবগার জগতটাও ওই ধরনেরই জটিলতাতেই ভরা, এবং সেটা দুনিয়ার তুলনায় কম তো নয় বরং বেশি। হিন্দুরা, বুলবুল আর গুড়িয়া, দুজনেই তারা খোয়াবগায় থাকতে আসার আগে বোম্বের সেই আনুষ্ঠানিক (প্রচণ্ড যন্ত্রণাময়) পুরুষাঙ্গ কর্তনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাড় হয়েছে। বোম্বে সিল্ক আর হীরারও এমনটা করতে পারলে ভালো লাগত, কিন্তু তারা ছিল মুসলিম আর বিশ্বাস করত যে ইশ্বর নিজেদের প্রদত্ত লিঙ্গ পরিবর্তন করতে ইসলাম তাদের নিষেধ করে, তাই তারা মানিয়ে নিত, কোন একভাবে, ঐসব বাধা নিষেধের মধ্যেই। বেবি, রাজিয়ার মতই, একজন পুরুষ ছিল যে পুরুষই থাকতে চাইত কিন্তু চাইত যে প্রত্যেক একদিন পর একদিন সে নারী হয়ে উঠবে। উস্তাদ কুলসুম বাঈয়ের দিক থেকে, তিনি বলতেন যে ইসলামের ব্যাপারে বোম্বে সিল্ক আর হীরার ব্যাখ্যার সাথে তিনি একমত না। তিনি আর নিম্মো গোরাখপুরী- যারা ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের লোক-সার্জারী করে নিয়েছিলেন। তিনি একজন ডাক্তার মুখতারকে চিনতেন, কুলসুম বাঈ বললেন, যিনি ভরসাযোগ্য আর ফালতু কথা বলেন কম এবং নিজের রোগীদের নিয়ে পুরান দিল্লির প্রত্যেক গলি আর কূচার মধ্যে গাল গল্প ছড়িয়ে বেড়ান না। তিনি আঞ্জুমকে বললেন তার এটা ভেবে দেখা উচিত আর সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত সে কি করতে চায়। পুরো তিন মিনিট নিল আঞ্জুম সিদ্ধান্ত নিতে।

ড. নবী যতটা ছিলেন তার তুলনায় ড. মুখতার ছিলেন দেখা গেল আরো অনেক বেশি আশ্বস্তকারী। তিনি জানালেন তিনি আঞ্জুমের পুরুষাঙ্গগুলোকে বাদ দিয়ে দিতে পারবেন আর চেষ্টা করবেন তার বিদ্যমান যোনিপথটিকে আরো ফুটিয়ে তুলতে। তিনি পিলের পরামর্শও দিলেন যেগুলো তার কন্ঠস্বরকে পাতলা করে দিবে আর তাকে স্তন তৈরি করতে সাহায্য করবে। একটু কম টাকার মধ্যে, কুলসুম বাই জোর দিলেন। একটু কম টাকার মধ্যেই, ড. মুখতার রাজী হলেন। কুলসুম বাঈ হরমোন আর সার্জারীর জন্য টাকা দিলেন; আঞ্জুম বছরগুলোর পরিক্রমায় সেটা তাকে ফিরিয়ে দিলেন, বেশ কয়েকবারে।

সার্জারীটা কঠিন ছিল, সেরে ওঠাটা তার চেয়েও বেশি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা একটা প্রশান্তি হয়ে আসল। আঞ্জুমের মনে হল যেন তার রক্ত থেকে একটা কুয়াশা সরে গেছে আর এখন সে পরিষ্কার ভাবে চিন্তা করতে পারছে। ডাক্তার মুখতারের যোনিটা, যাই হোক, দেখা গেল একটা ভাওতা। এটা কাজ করত, কিন্তু যেভাবে তিনি বলেছিলেন সেভাবে না, এমনকি দুটো সংশোধনকারী সার্জারীর পরেও না। তিনি টাকা ফেরত দেয়ার কোন প্রস্তাব দিলেন না অবশ্য যদিও, পুরোটা অথবা আংশিক কোনভাবেই না। তার বিপরীতে দেখা গেল, দিশেহারা লোকজনের কাছে ভেজাল, স্বল্পমানের শারীরিক প্রতঙ্গ বিক্রি করে, তিনি বেশ আরামের সাথে আয়-রোজগার করে গেলেন। তিনি মারা গেলেন একজন বিত্তশালী লোক হিসেবে, যার লাক্ষী নগরে দুটো বাড়ি, নিজের প্রত্যেক ছেলের জন্য একটা করে, আর তার কন্যা বিবাহিত, রামপুরের একজন ধনবান বিল্ডিং কন্ট্রাক্টারের সাথে।

যদিও আঞ্জুম হয়ে উঠলেন একজন কাক্সিক্ষত প্রেমিকা, একজন দক্ষ দাতা আনন্দের, যেটা তার লাল ডিসকো শাড়ি পরা অবস্থায় হয়েছিল সেটাই ছিল তার জীবনের শেষ অর্গাজম। আর সেই ‘প্রবণতাগুলো’ যদিও রয়ে গেল যাদের ব্যাপারে ড. নবী তার বাবাকে সাবধান করে দিয়েছিলেন ড. মুখতারের পিল পাতলা করেছিল তার গলার স্বরকে। কিন্তু সেটা তার কন্ঠের ঝংকারকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলল, কর্কশ করে দিল ধ্বনির মাধুর্যকে আর কেমন অদ্ভুত, ঘ্যাস ঘ্যাসে করে দিল, যেটা মাঝে মাঝে এমন শোনাত যে একটার বদলে দুটো কন্ঠস্বর ঝগড়া করছে পরস্পরের সাথে। অন্য মানুষদেরকে এটাতে ভয় পেয়ে যেত। তবে এটা তার মালিককে সেভাবে ভয় দিত না যেভাবে দিয়েছিল তার ঈশ্বর-প্রদত্তটি কন্ঠটি। এবং উল্লসিতও করত না এটা তাকে।

তার জোড়া-তালি দেয়া শরীর আর আংশিক বুঝতে পারা স্বপ্নগুলো নিয়ে আনুজুম খোয়াবগায় জীবনযাপন করেছিলেন ত্রিশ বছরের বেশি সময়।

তিনি ছেচল্লিশ বছর বয়সে ঘোষণা দিলেন যে তিনি বিদায় নিতে চান। মুলাকাত আলি মারা গিয়েছিলেন। জাহানারা বেগম শয্যাশায়ী থাকতেন বেশির ভাগ সময় এবং সাকিব ও সাকিবের পরিবারের সাথে চিতলী কবরের পুরাতন বাড়িটার একটি অংশে বাস করতেন(অন্য অর্ধাংশটি ভাড়া দেয়া হয়েছিল একজন আজবধরনের, সংশয়ী যুবককে যে জীবনযাপন করত হাতবদল-হওয়া ইংলিশ বইয়ের উঁচু উঁচু স্তম্ভের মাঝে যেগুলো তার মেঝের উপর, বিছানার উপর এবং সকল সম্ভাব্য আনুভুমিক স্থানের উপর স্তুপ করা থাকত)। আঞ্জুম মাঝে মাঝে আসতে আমন্ত্রিত ছিলেন, কিন্তু থাকতে নয়। খোয়াবগায় ঘর বেঁধেছিল বাসিন্দাদের একটা নতুন প্রজন্ম-পুরানদের মধ্যে শুধু উস্তাদ কুলসুম বাঈ, বোম্বে সিল্ক, রাজিয়া, বিসমিল্লা আর ম্যারি থেকে গিয়েছিল।

আঞ্জুমের কোথাও যাওয়ার ছিল না।

চলবে…

 

আগের পর্ব পড়ুন…

দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস (বাংলা অনুবাদ) ১ম পর্ব

 

নবযুগ সম্পাদক এর ব্লগ   ১,৩৯৫ বার পঠিত