শাকিল মুস্তাফা
  • dav

    প্রিয় শাকিল,
    শীত আসন্ন কার্তিকের বিষন্ন সন্ধ্যা-দুপুরে তেমন কিছু করতে ইচ্ছে করে না। আমার কেবল দুর বহুদরে যেতে ইচ্ছা করে, যেখানে মেঘ এসে পায়ের নিচে চলে গেছে আর দুরের গ্রামগুলো মেঘের রঙ মেখে আশ্চর্য্য সাতরঙে সেজেছে এমন কোনো নির্জনে বসে বসে শুধু তোমার কথা ভাবতে ইচ্ছে করে।
    এখন তুমি কেমন আছো? তোমারও কি চুল পড়া শুরু হয়েছে? ক্রনিক মাইগ্রেন, হাইপার টেনশন, ধৈর্য্য হারানো, অল্পেতে রেগে যাওয়া, রাতের পর রাত ঘুম না আসায় তোমার আজব কালো চোখের নিচে কাজল কালো মেঘ একে দিয়েছে কেউ?
    বাড়ির পিছনের কদবেল গাছটা কেটে ফেলেছে জানো? আর পুকুরের ওই ধারে মাঠে ছেলেরা বিকালে দল বেধে খেলতেও যায় না। পাড়ার ছেলেরা এখন সবাই যে যার মতো নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বৈঠকখানার দেয়াল গুলোও ভেঙ্গে পড়ছে। সেখানে আবার ছোট ছোট ছেলেরা খেলতে শুরু করেছে যেমনটা তোমরা করতে।
    দুনিয়ার আজ কঠিন অসুখ!

    কতকাল তোমাকে দেখি না। সেসব কবেকার কথা! হুটহাট তবুও এইসব দুর্বিনিত জীবনের মধ্যে ব্যস্ত ট্রাফিক সিগনালে চলে আসো কোথা থেকে।
    সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো। নেশা থেকে সেদিন ড্রাইভ করছিলাম। ভিড়েভাট্টা ছিল না চৌরাস্তার মোড়টাতে। বৃষ্টি ছিল! বুলবুলের আগমনে, সেদিন আকাশের সে কি কান্না! দেখলাম তুমি রাস্তা পার হচ্ছো। এক মুহুর্ত দেখেই গাড়ি ফেলে আমি ছুটে গেলাম। কেমন বিবর্ন তুমি। শরীর ভেঙ্গে গেছে। ততক্ষণ উৎসুক ছেলেমেয়েরা আজব এই মানুষটার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। ট্রাফিক পুলিশও সম্ভবত সব ফেলে আমার কান্ড দেখছিল। উপস্থিত কারোর ভেতর কোনো উদ্বেগ বা ঘরে ফেরার তাড়া দেখিনি। তুমি পেছন ফিরে আমাকে বললে, কাউকে খুজছেন?
    মূহুর্তে বুঝতে পারলাম এই উদভ্রান্তের শহরে তুমি আর নেই। তুমি হয়তো তখন বহু শহর পরে কোথাও শান্ত সকালে কফির সুতীব্র ঘ্রানে মিহিন রবীন্দ্র সংগীত শুনছো। অপরিচিত সেই মানুষকে দুঃখিত বলে চলে এলাম।

    প্রিয় শাকিল,
    এইভাবে কতদিন খুজলাম তোমাকে। অপরিচিত বিমান বন্দর, সমুদ্রের তট ধরে কিম্বা সবুজ পাহাড়ে।
    একটাই কাজ ছিল। লেখা। কতদিন তোমার খাতায় লিখেছি ক্লাসের ফাকে ফাকে। আর দেখেছি মাথাভাঙ্গার চলমান দৃশ্য।
    আজকাল কিছু লেখা হয় না। কি লিখবো? সামনে কত ইস্যু। পেয়াজের দামে শার্ট কেনা যায়। এখানে দমবন্ধ করা অত্যাচার করলেও কারো বিরুদ্ধে টু শব্দ করা যায় না। এখানে গুম, নিখোজ হওয়া, স্রেফ হারিয়ে যাওয়া এসব এখন নিশ্বাস নেবার মত স্বাভাবিক ঘটনা।
    যারা সোনালী রাঙা প্রভাব আনবে বলে একদিন আমাদের গল্প শুনিয়েছে তারা আজ নিজেরা অন্ধকারে দূর্নীতির আলোয় বিপ্লবকে জ্বালিয়ে রেখেছে।
    অথচ এই বিষন্ন হেমন্তকালে আমি শুধু তোমার কথা ভাবতে চাই। পেয়াজের দাম, গুলতেকিনের বিয়ে, ট্রেনে কাটাপড়া মানুষর হাত ও মুখ, সিআই কর্তৃক ইভো মোরলেসের উৎখাত, রামমন্দির ফের নির্মান কিম্বা কেরালার বামপন্থি সরকারের হাতে ক্রসফায়ারে নিহত কমরেডদের মুখ আমার চোখের সামনে ভাসুক তা চাই না।
    সারাদিন পার করে কোনো পাহাড়ি গ্রামে রাত এলে অনেক গল্প করতে চাই। চাদমারি মাঠ কিংবা দিঘ্রী বিলে হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্প। অথচ তোমার সাথে আমার দেখাই হয় না। অথচ আশ্চর্য্য ছাতিমের গন্ধ চলে যাচ্ছে, বিষন্নতার কার্তিক চলে যাচ্ছে,
    আরেকটা আত্মহত্যার দিন চলে যাচ্ছে।

0 Shares