অভিজিৎ রায়ের চলে যাওয়াটা ছিল এক অসম্ভব ব্যাপার। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো।  অভিজিৎ জানতেন, দেশে গেলেই তাকে মেরে ফেলবে। কারণ, বেশ মৃত্যু-হুমকির উপর তিনি ছিলেন। কিন্তু তিনি মৃত্যুর কাছে হেরে যাননি কিম্বা হার মানেননি। জীবনের কাছে সত্য-সুন্দর প্রতীক হয়ে প্রতিটি মুহূর্তকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, মানুষের বেঁচে থাকার অর্থটা।  মনুষ্যত্বহীন বেঁচে থাকা যে মৃত্যুর সমান, তা তিনি মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দেশে গিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। মানুষের বাক-স্বাধীনতা এবং বিজ্ঞান ভিত্তিক চিন্তা-চেতনা স্ফুরণের  জন্য যে  সংগ্রামী জীবন  তার, সে জীবন কেন মৃত্যুকে ভয় পাবে! মৃত্যু অভিজিৎ রায়কে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে বটে, কিন্তু এই মৃত্যুই আবার আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে অভিজিৎ এর সত্য সুন্দর এক মানবিক পথ। যে পথ দিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাই। অভিজিৎ থাকবেন আমাদের চেতনায় আমাদের চিন্তায়। খুনিরা সেই চেতনা খুন করবে কীভাবে!? সত্য, সূর্যের মতো জ্বলজ্বল, যতই অন্ধকার এসে তাকে ঢেকে দিক, এই অমানিশার ঘোর যে একদিন কাটবেই। অভিজিতের মতো আলোরদিশারীদের পথধরে আমরাও সেই অপেক্ষায় থাকি।

২০১৫ এর ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হয়ে আসার সময় মিলন চত্বরের কাছে অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তখনো বইমেলার সরগরম চারদিক। পথচারী দেখছে,  পুলিশ দেখছে; অভিজিৎকে কোপাচ্ছে। অথর্ব প্রশাসন আজো অভিজিৎ এর মৃত্যুর কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এমনকী পরেরদিন যখন বইমেলায় যাই, তখনো কারোমধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখিনি। সবকিছু যেনো আগের মতো চলছে। আনন্দ, উচ্ছ্বাস, আড্ডা, টিভি মিডিয়ার দৌড়াদৌড়ি; সবই ছিল আগের মতো। শুধু ছিল না অভিজিৎ রায়। যিনি এই বইমেলারই একটি অংশ হয়ে জুড়েছিলেন অনেকের হৃদয়ে। যে বইমেলা অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ  বাংলার শিল্প সংস্কৃতির  পিঠস্থান, সেই চেতনার অগ্রপথিক অভিজিৎ রায় তাকেই কুপিয়ে মারা হলো, অথচ সেই বইমেলা নীরব ভূমিকা পালন করে গেলো এবং এখনো যাচ্ছে। এই কষ্ট বুকেচেপে চলছে এমন অনেক চেতনাধারী আর রেখে যাচ্ছে্ন জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন।

অভিজিৎ রায়ের, ‘আলোর হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী‘র বইটি, যাতে আছে মুক্তচিন্তার প্রসার, মৌলবাদীদের আষ্ফালন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ; বৈজ্ঞানিক ও সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা অভিজিৎ রায়ের আরেকটি বই ‘সমকামিতা’; ২০১২ সালের বইমেলার শেষদিকে বের হয় তাঁর আরেকটি বই ‘ভালবাসা কারে কয়’; এখানেও তিনি বিজ্ঞানভিত্তিক ও তার নির্মোহ যৌক্তিক চোখে বিজ্ঞানের ধারাবাহিকতায় বর্ণনা করেছেন ভালোবাসার অপার্থিব বিস্ময়কে; অভিজিৎ রায়ের সর্বশেষ বই প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালে, একেবারেই ভিন্ন একটি বিষয়ে। ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো: এক রবি-বিদেশিনীর খোঁজে’ বইটিতে অভিজিৎ রায় একজন হৃদয়ের কারিগরের মতো খুঁজে বের করেন রবীন্দ্রনাথের হৃদ অলিন্দের ভাব, ভিন্নভিন্ন আঙ্গিকে। এভাবেই অভিজিৎ রায় তার সৃষ্টিশীল, মননশীল কাজের মধ্যে বেঁচে থাকবেন, বেঁচে আছেন আমাদের হৃদয়ে।তিনি বিজ্ঞান ভিত্তিক যুক্তির আলোয় আমাদের মনের অন্ধকার দূর করার ব্রত নিয়েছিলেন। সে কারণেই তিনি অপরিহার্য। বইমেলাতেও তার বই থাকবে এই প্রত্যাশা করি। তিনি আমাদের আলোর পথিক হয়ে থাকবেন। অভিজিৎ রায়ের মতো আমরাও বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ থেকে একদিন অন্ধকার দূর হবেই।

শুভ জন্মদিন অভিজিৎ।