জোবায়েন সন্ধি

ড. অভিজিৎ অভিজিৎ রায়ের জন্ম ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ। তিনি একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশী-মার্কিন প্রকৌশলী, লেখক ও ব্লগার।

সিংগাপুরে পিএইচডি করাকালীন প্রবাসী লেখক ড. আলমগীর হুসেন এবং জিহাদ বইয়ের লেখক এম,এ খানের প্রেরণায় তিনি ২০০১ সালের দিকে সমমনা কয়েকজন লেখকদের নিয়ে মুক্তমনা নামক ব্লগসাইটটি তৈরি করেন। তিনি এই ব্লগসাইটের ৮ জন নিয়ন্ত্রকের অন্যতম একজন ছিলেন।

 

লীগ সরকার মুক্তমনা ব্লগারদের গ্রেফতারের পরে এভাবেই অপমানজনকভাবে মিডিয়ার সামনে হাজির করে

 

বাংলাদেশের মুক্ত চিন্তার আন্দোলনের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে সরকারের সেন্সরশিপ এবং ব্লগারদের গ্রেফতার ও কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের সমন্বয়কারক ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তাঁর প্রচেষ্টায় অনেক বিপদগ্রস্থ লেখক ও ব্লগার নিরাপদে দেশ ছেড়ে অন্যদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তাঁর জীবদ্দশায় বাংলাদেশের জীবন ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকদের পক্ষে আন্তর্জাতিকভাবে জনমত ও সহায়তার জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বস্তুত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশি ব্লগার-লেখকদের আজকের যে অবস্থান, তার পিছনে মূল অবদান অভিজিতের।

 

ব্লগারদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে অভিজিৎ আন্তর্জাতিকভাবে স্বাক্ষর সংগ্রহ ও ক্যাম্পেইন করেন

 

গ্রেফতারকৃত ব্লগারদের মুক্তির দাবিতে শাহবাগে প্রতিবাদ, ছবিতে নীলয় নীলও ইসলামি জঙ্গীদের হাতে নৃশংসভাবে খুন হন।

 

তিনি পেশায় একজন প্রকৌশলী হলেও মুক্তমনায় লেখালেখির জন্য অধিক পরিচিত ছিলেন। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৬ তারিখ একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার সময় ইসলামি জঙ্গী গোষ্ঠীর সন্ত্রাসীরা তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ওই ঘটনায় তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা’ও মারাত্মক আহত হোন এবং প্রাণে বেঁচে যান। তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও একজন স্বনামধন্য বিজ্ঞান লেখক ও মানবাধিকারকর্মী, যিনি ‘বন্যা আহমেদ’ নামেই বেশি পরিচিত। অভিজিতের অবর্তমানে বাংলাদেশি লেখক-ব্লগারদের রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

ড. অভিজিৎ রায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে যন্ত্র কৌশলে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্ত এবং উচ্চ শিক্ষার জন্য বাংলাদেশ ছাড়ার আগে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি সিংগাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর এবং ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি সেখান থেকে আটলান্টা, জর্জিয়ায় যান এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানে একজন প্রকৌশলী হিসাবে কাজ করতেন।

পেশায় একজন প্রকৌশলী হলেও তিনি নিয়মিত ব্লগ ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালেখি করতেন এবং বিজ্ঞান লেখক হিসেবেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। ইসলামি জিহাদি ঘাতকদের হাতে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁর লেখা ১০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞান, নাস্তিকতাবাদ, বাস্তববাদ, সন্দেহবাদ ও যৌক্তিকতার ওপর ভিত্তি করে রচিত অবিশ্বাসের দর্শন এবং বিশ্বাসের ভাইরাস নামক তাঁর দুটি বাংলা বই পাঠকমহলে বহুমুখী সমালোচনা ও জনপ্রিয়তা লাভ করে।

অভিজিৎ রায় ইন্টারনেট, ম্যাগাজিন এবং দৈনিক পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তাঁর লেখার বিষয় ছিল আধুনিক বিজ্ঞান, নাস্তিকতা, সমকামিতা এবং দর্শন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁর লেখা প্রকাশিত বইগুলোর বিবরণ-

১. আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’(২০০৫), অঙ্কুর প্রকাশনী

২. মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে (২০০৭), অবসর প্রকাশনী

৩. স্বতন্ত্র ভাবনা: মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি (২০০৮), চারদিক প্রকাশনী

৪. সমকামিতা: বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান (২০১০), শুদ্ধস্বর প্রকাশনী

৫. অবিশ্বাসের দর্শন (২০১১), শুদ্ধস্বর প্রকাশনী

৬. বিশ্বাস ও বিজ্ঞান (২০১২),

৭. ভালবাসা কারে কয় (২০১২), শুদ্ধস্বর প্রকাশনী

৮. শূন্য থেকে মহাবিশ্ব (২০১৪), শুদ্ধস্বর প্রকাশনী

৯. বিশ্বাসের ভাইরাস (২০১৪), শুদ্ধস্বর প্রকাশনী

১০. ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো: এক রবি-বিদেশিনীর খোঁজে (২০১৫), শুদ্ধস্বর প্রকাশনী

 

অভিজিতের জন্মদিনে বাংলাদেশ, ভারত ও পৃথিবীর বাঙলা ভাষাভাষি সকল মুক্তচিন্তার লেখকদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। মুক্তচিন্তার লড়াইয়ের আকাশে চিরকাল জ্বল জ্বল করে জ্বলবে অভিজিৎ রায়ের নাম।

 

 

জোবায়েন সন্ধি

বার্লিন, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

জোবায়েন সন্ধি এর ব্লগ   ১৩৫ বার পঠিত