জিয়া হাসান

বাংলাদেশের শীর্ষ আমলারা তাদের পেটি সাংবাদিক, পুলিশ, দুদক এবং জাজদের সাথে নিয়ে কীভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি করে – সেইটা নিয়ে একটা গল্প শুনলাম।

গল্পটা ডিজিএফআই’কে দিয়ে এস-আলমের হাতে ৮ টি বেসরকারি ব্যাঙ্ক দখল করার চেয়েও বেশী চিত্তাকর্ষক।

কিন্ত, বিষয়টা ভাবালো?

কারণ আমরা যারা রাজনীতির একটা জনগণমুখী পরিবর্তনের কথা বলি। দ্বি-দলীয় ক্ষমতাকাঠামো পরিবর্তনের কথা বলি- (এহেম এহেম, আমিও বলি)- তারা কি আসলে বাংলাদেশের ক্ষমতাকাঠামো চিনি?

ক্ষমতা কীভাবে তৈরি হয়, ক্ষমতা কীভাবে বণ্টিত হয়, ক্ষমতা কীভাবে পরিবর্তিত হয় – সেইটা সম্পর্কে আসলে আমরা কতদূর জানি?

আমার মনে হয়, বাংলাদেশে যারা সরকারের সাথে ব্যবসা করেন না, বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন না, কিংবা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত না, বা যারা রাষ্ট্রীয় লুটে নিজেরা সরাসরি বিগত কয়েকবছর ধরে পারটিসিপেট করেন না বা ফার্স্টহ্যান্ডে ইনফরমেশন পান না
– তারা বর্তমানের বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে ন্যূনতম ধারনা রাখেন না।

বিশেষত রাজনীতিবিদ, ইন্টেলেকচুয়াল, ফেসবুকে সর্বরোগবিশেষজ্ঞ কবিরেজ (উদাহরণ জিয়া হাসান), ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক বা আইএমএফের কনসালট্যান্ট, ডেভেলপমেন্ট এক্টিভিস্ট হতে শুরু করে কমেন্টে ঝড় তোলা – আপামর তাওহিদি এবং শিরিকি জনতা- কেউ আমার মনে হয় বাংলাদেশের ক্ষমতা কীভাবে তৈরি হয়, কীভাবে বণ্টিত হয় এবং কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা সম্পর্কে ধারনা রাখেন না।

এখনো আশির দশকের মতো সাম্রাজ্যবাদ আর পুঁজিবাদ মডেলে, নব্বইয়ের মতো ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক এবং আইএমএফ মডেলে, একবিংশ শতকের মতো নিউ লিবারেল মডেলে অথবা ক্ষমতার হাওয়া ভবনের মডেল দিয়ে যারা ক্ষমতাকে বোঝেন এবং সেই মডেলটার পরিবর্তন চান – তারা ক্লিয়ারলি এখনো দেখতে পাচ্ছেন না- তাদের সেই মডেলগুলো এখন আর নেই।

এখন একটা নতুন মডেল আছে, যেইটা একটা মাফিয়া সিস্টেমের মত কাজ করে- যে সিস্টেমে, সাংবাদিক, আমলা, বিচারক, পুলিশ, রাজনীতিবিদ, আইনপ্রণেতা সবাই জলপাই ব্যবসার আড়ালে একটা পূর্ণাঙ্গ লুটের জন্যে ইন্টেগ্রেটেড সিস্টেম তৈরি করেছে, যার একমাত্র মোটিভ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ লুট করে, নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেওয়া। এবং এই সিস্টেমের শীর্ষপর্যায়ে এখন রাজনীতিবিদেরা নয়- বরং বসে আছে আমলা, পুলিশ, মিলিটারি, প্রশাসন ।

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরাও আজকে এই গ্রুপদের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করতে পারবেনা।

ফর একজাম্পল- কাল যদি শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নেন এই সিস্টেম থেকে উনি দুর্নীতি বন্ধ করে দেবেন, পরেরদিন উনাকে ক্ষমতা থেকে চলে যেতে হবে। এবং তারপরে এমন একজন লোক আসবে যে স্বভাবতই প্রশাসনকে নিজের মত লুট করতে দেবে। একটা সিস্টেমের চিফ বেনিফিশিয়ারি কেন সেই সিস্টেমকে ভাঙতে চাইবেন, সেইটা যদিও একটা হাইপোথেটিকাল প্রশ্ন।

কিন্ত এই প্রশ্নের মাধ্যমে আমরা বুঝতে চাইছি যে, ক্ষমতা আজকে এককভাবে শেখ হাসিনার হাতেও নাই। এইটা বিভিন্ন লেয়ারে এমনভাবে বণ্টিত এবং ২০১৮ সালের প্রশাসনিক ক্যু-এর মত ইলেকশানের পরে সেইটা এমনভাবে প্রশাসনের হাতে আরো বেশী ছেড়ে দিতে হয়েছে, তাতে এদের কন্সেন্সাসের বাহিরে গিয়ে কিছু করার সামর্থ শেখ হাসিনারও নাই।

হাওয়া ভবনের আমলে ক্ষমতার শীর্ষে যদি হাওয়া ভবন থেকে থাকে, তাকে প্রশ্ন করার মতো মিডিয়া ছিল, সিভিল সোসাইটি ছিল।

আমার মনে হয়, মিডিয়া (যারা ম্যাটার করে) এখন দূর্নীতি-তুর্নীতি নিয়ে অনেক কথা বলতে পারবে, মন্ত্রণালয়ের হাজারকোটি টাকা দূর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে কিন্ত, যদি তথ্য প্রমাণ হাতে আসেও, তবে, সুনির্দিষ্ট কোন শীর্ষ আমলাকে নিয়ে ডিটেল রিপোর্ট করতে পারবে না।

পারবে না বিভিন্ন ধরনের আইনের গ্যাঁড়াকলে, অথবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অথবা নিজের বিজনেস ইন্টারেস্ট রক্ষার কারণে। এখন একটা সিস্টেমে স্ট্যাটাস কো কীভাবে তৈরি হয়েছে ওইটা পরের প্রশ্ন- কিন্ত পারবেনা এইটা নিশ্চিত। যেটা আমাদের বলে দেয়, বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের ক্ষমতার বণ্টনে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। এবং এই পরিবর্তনে আমলা, পুলিশ, মিলিটারি, বিচারক সমাজের শীর্ষ লেয়ারে পৌঁছে গেছে।

এবং এলিট কিছু রাজনীতিবিদ বাদে আজকে- এই গ্রুপটার হাতেই এলিট সেটেলমেন্ট হচ্ছে- মানে কে ক্ষমতায় থাকবে, কে থাকতে পারবেনা এই প্রশ্ন নির্ধারিত হচ্ছে। এর পরিষ্কার উদাহরণ আমাদের আছে যে, ২০০৭ সালে এলিট সেটেলমেন্ট সিভিল সোসাইটি এবং তাদের বয়ানের ভিত্তিতে হয়েছে, ২০১৮ তে সেই এলিট সেটেলমেন্ট হয়েছে- আমলা পুলিশ প্রশাসনের হাতে। ফলে আমাদের এলিটদের ক্ষমতার একটা ব্যাপক রূপান্তর হয়েছে। পুরাতন এলিট দূর্বল হয়েছে নতুন এলিটের আবির্ভাব হয়েছে। যেখানে পুলিশ, প্রশাসন, জাজ, মিলিটারি সমাজের শীর্ষ এলিট হিসেবে আবর্তিত হয়েছে। যদিও এখানে আওয়ামী লীগ এবং প্রশাসনের লুটের একটা সিম্বায়টিক রিলেশনশিপ আছে। ফলে, তারা কেউই অন্যের লুটের বিরোধিতা করেনা বরং একসাথে লুটপাট করে।

আমার এই আলোচনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, ইন্টেলেকচুয়াল, সিভিল সোসাইটি, এবং বিরোধী দল ইনক্লুডিং বিএনপি কমপ্লিটলি আউট অফ টাচ। তাদের এই অজ্ঞতার বিপদ হচ্ছে, সিস্টেমকে না বোঝার কারণে তারা হাইপোথেটিক্যাল কোন সলিউশান ও প্রস্তাব করতে পারছেনা।

তারা সংবিধানের মধ্যে, বা দ্বিদলীয় চক্র বা ভারতের ইন্টারভেনশান, বা কালচারাল হেজেমনি ইত্যাদি জায়গায় সমস্যা দেখছেন এবং সেই সমস্যার সমাধান খুঁজছেন- যেখানে সমস্যাটা আর সে জায়গায় নাই।

সিস্টেমের পার্ট অব দা প্রব্লেমকে মূল প্রব্লেম হিসেবে দেখে সেটার যে সলিউশান তারা প্রস্তাব করছেন, সেই সলিউশানটা শুনতে ভাল লাগলেও কিন্ত সেটা এখন সিস্টেমের মূল প্রব্লেম নয়।

সিস্টেমের ক্ষমতা কার হাতে আছে এবং কার হাত থেকে ক্ষমতা নিতে হবে সেইটা বোঝার মূল জায়গাটাকে গৌণ করে দেখে যার যার ইচ্ছা মত ভালো লাগার, এক্সপারটাইজের এবং বায়াসের ইস্যুকে রাষ্ট্রের প্রধান ইস্যু হিসেবে হাজির করে সেটার সলিউশান প্রস্তাব করছেন।

যে কোন রাজনীতি বা আদর্শকে বর্তমানের সমস্যার সমাধান করতে হবে। চোখের সামনে দেখা রিয়েলিটিকে উপেক্ষা করে অতীতের দেখা হাইপথেটিকাল প্রব্লেমকে প্রব্লেমেটাইজ করে সলিউশান কেউ অফার করবে সেই সলিউশানকে জনগণ সিরিয়াসলি নেবেনা।

কারণ, এরা বোকা হলেও জনগণ বোকা নয়। জনগণ বুঝতে পারে, এই গ্রুপটা নিজেরা একটা বাবলের মধ্যে থাকার কারণে, সিস্টেমের মূল প্রব্লেমটাই ধরতে পারে নাই। কারণ জনগণ তার প্রতিদিনের চলাফেরায় এই প্রব্লেমটা দেখে এবং বোঝে। যদিও সমাধানটা কোথায় তা তারা জানে না।

বাংলাদেশ সামন্ততন্ত্র, ক্রনি ক্যাপিটালিজম পার হয়ে একটা মাফিয়া রেজিমের মডেলে পৌঁছেছে- যেই মডেলটা নিয়ে আমি মনে করি ডেভেলপমেন্ট ইকনমিক্স ফিল্ডেও যথেষ্ট পরিমাণ গবেষণা হয় নাই। ফলে পশ্চিমা মডেলে চিন্তা করে, এবং পশ্চিমের স্টাডির ওপরে ভিত্তি করে এটাকে এক্সপ্লাইন করা খুব কঠিন।

কারন , এইটা খুব ইউনিক না হলেও মাফিয়া সিস্টেমের মডেলে জলপাই ব্যবসার আড়ালে খুললাম খুল্লা লুটের জন্যে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার খুব এডভান্সড একটা মডেল, যার তুলনীয় কোন উদাহরণ কনটেম্পোরারি পৃথিবীতে নাই। এমনকী মাফিয়া মডেল দিয়েও এইটা ব্যখা করা কঠিন, কারন, মাফিয়াদের কালচারাল হেজেমনি থাকেনা। ফলে এইটা খুব কমপ্লেক্স একটা সিস্টেম যেইটার কোন ব্যাখা আমি কোন বই পুস্তকে পাই নাই।

এখন কেউ আবার বলে বইসেন না, তাহলে আপনি সলিউশান বলেন। আমার কাছেও সলিউশান নাই। আমার ধারনা এই সিস্টেম নিজে নিজে একটা এন্ট্রপির মধ্যে দিয়ে ধংস হয়ে যাওয়ার আগে, এই ধরনের কমপ্লিট এবং এডভান্সড একটা সিস্টেমকে চেঞ্জ করা সম্ভব না।

0 Shares
জিয়া হাসান এর ব্লগ   ১৭৭ বার পঠিত