নাজিব তারেক

মানবসমাজ যখন শিকারনির্ভর ছিল তখন বিবাহ ছিলনা। ছিল নিছক যৌনতা ও প্রেম। বর্তমানে (এবং চিরকালে বা সনাতনে) যে সমাজে ‘বিবাহ নারীদের পেশা নয়’ সে সমাজে প্রেম ও যৌনতার স্বাধীন চর্চা পরিলক্ষিত, অর্থাৎ নারীদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা যৌনতা ও প্রেমের (এবং বিবাহের) প্রশ্নে পুরুষদের ইচ্ছা অনিচ্ছার ন্যায় সমান গুরুত্ববহ।

 

আদিম সমাজ ও আজকের সমাজের যৌনভাবনা অালাদা। আদিমসমাজের যৌনভাবনায় উত্তরাধিকারের কোন ধারণাই ছিল না, ছিল সাধারণ প্রাণিজ বংশ বিস্তার। সমকালের নগর সমাজের সাধারণত যাদের নিম্নশ্রেণি বা দরিদ্র শ্রেণি হিশেবে চিহ্নিত করা হয় সেই মানবাকৃতিতেও উত্তরাধিকার ভাবনা তেমন কার্যকর নয়, তাই তাদের সন্তানাদির সংখ্যা পঙ্গপালের ন্যায় এবং তারা আয় ইনকামের উপায়!

 

প্রাচীন কৃষি সমাজের বিকাশ ধারার প্রয়োজনে মানুষের প্রয়োজন পড়লো এক স্থানে স্থায়ী হওয়ার। আর সে সময়েই বিকাশ ঘটলো ‘সম্পদ ভাবনার’, যার সূচনা ঘটেছিল আরো অাগেই ‘সঞ্চয়’ প্রয়াসের কালে। এই সম্পদ ভাবনার বিবিধ পর্যায়ে ‘সন্তান’ ভাবনা ও সন্তান লাভের উপায় ‘যৌন’ ভাবনার বিকাশ এবং তা ‘বিবাহ’ নামক রীতিতে পরিণত। হ্যাঁ, এইসব ভাবনার বিবিধ বয়ানই ‘ধর্ম’ নামে আমাদের সামনে উপস্থিত।

 

ধর্মের সংখ্যাপ্রাচুর্য ও ভূগোল বা শিকড়ছিন্নতা বা রপ্তানী-আমদানী যোগ্যতার সংকট এবং ব্যাক্তি মানবাকৃতির মস্তিকের বিবিধ মান যে সামাজিক শৃঙ্খলা তৈরি করেছিল তা এক মানবেতর পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সেই শৃঙ্খলকে ভাঙতে ‘এ মাটি আমার মা’ শ্লোগানের জন্ম এবং তা বিবিধ পর্যায় অতিক্রম করে আজকের ‘রাষ্ট্র’ ধারনায় উপনিত। ইউরোপ রাষ্ট্র ধারনার বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেছে তা হলো ধর্মের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রের হাতে অর্পন করেছে। আর রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ক্ষমতায় জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে শিক্ষা (প্রাথমিক শিক্ষা বা পড়বার সক্ষমতা¹, বিদ্যালয় বা পেশা বা কারিগরি শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা বা গবেষণা); মতামত (গ্রন্থ রচনার অধিকার² ও গণমাধ্যম) কে করে দিয়েছে সবার জন্য উম্মুক্ত ও সদা সচল…

najib-tareque-socio-note-082

 

সম্পদ চেতনা বা পুঁজির ধারনাই বহু দেবতা থেকে একেশ্বরবাদের দিকে মানুষের ভাবনাকে নিয়ে গেছে। একেশ্বরবাদের ছাতার নিচের মানুষকে একটি আইন কাঠামোর অধীনে আনা যায় বা গেছে। মানুষের অন্তর্গত শৃঙ্খলাবোধই তাকে আইন কাঠামোর প্রতি অনুগত করে এবং আইন কাঠামোই তার নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার রক্ষাকবজে পরিণত হয়। আবার আইন কাঠামোর অচলায়তনই তার নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার অন্তরায়। তাই সময়ের প্রবাহে নতুন নতুন ধর্ম বা আইন প্রণয়ন হয়েছে এবং নতুন অচলায়তন তৈরি হয়েছে। ব্যাক্তির সাথে গোষ্ঠীর যে সম্পর্ক বা লেনদেন তা-ই আইন, সেটা সামাজিক কিংবা ধর্মীয় কিংবা নৈতিক বা রাষ্ট্রীয়। রাষ্ট্র হচ্ছে এমন এক ব্যবস্থা যেখানে আইনসমূহ লিখিত বা সুনির্দিষ্ট হয় বা ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতামুক্ত হতে হয়। তাই এখানে আইন নিয়ে ক্রমাগত জন বা গণ বিতর্ক চলতে থাকে এবং সে বিতর্কের নিরিখে নতুন আইন প্রণয়নের আগে পূরণো বা বিদ্যমান আইন সমুন্নত থাকে।  এখানেই রাষ্ট্র ও ধর্মের পার্থক্য। ধর্ম কোন এক বিশেষ ব্যাক্তির বিশেষ সিদ্ধান্তসমূহকে স্থির ও অপরিবর্তনীয় ধরে সকল মানুষের অস্থিত্ব ও চিন্তা সক্ষমতাকে অস্বীকার করে। বৈদিক চিন্তকেরা কিংবা বুদ্ধ কিংবা মুহাম্মদ ব্যক্তির বা জনের চিন্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও তাকে কাঠামো প্রদানে ব্যার্থ হয়েছেন। রেনেসাঁর ইউরোপ সেখানেই সফল…

(বিঃদ্রঃ প্রচীন গ্রীক ও বৈদিক ভারত ব্যক্তির বা জনের চিন্তাকে কাঠামোবদ্ধ করতে সফল হয়েছিল বলে আমার মত। কিন্তু জন বা গণ চিন্তার অপ্রতুল যোগান সে কাঠামোকে দূর্বল করে ফেলে ও পৌরিহত্যকে ক্ষমতার অচলায়তন নির্মাণের সুযোগ করে দেয়।)

najib-tareque-socio-note-078

 

সংখ্যালঘু একটি ধর্মীয় বা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শব্দ। ‘আমি সংখ্যালঘু’ এ শব্দবন্ধ দিয়ে ব্যাক্তি রাষ্ট্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সাথে নিজের দূরত্ব তৈরি করে। এক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়কেই সে প্রধান করে তোলে এবং রাষ্ট্র ও তার অাইনকে অস্বীকার করবার সুযোগ তৈরি হয়। আর সুবিধাবাদী শোষক গোষ্ঠী সেই আইনহীনতারই সুযোগ নিতে থাকে এবং তারা দাসরাষ্ট্র বা ধর্মরাষ্ট্রের কাঠামোকে ব্যবহার করে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকেই সংখ্যালঘুতে পরিণত করে। এটা দূর করবার একমাত্র উপায় ধর্মকে আইন প্রণয়নে সুযোগ না দেয়া। ধর্ম পারিবারিক বা বিবাহ ও উত্তরাধিকার আইন আকারে রাষ্ট্রের আইন কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করে। পরিবার সমাজ বা রাষ্ট্রের ভিত্তি। আর রাষ্ট্রআইন কাঠামোর মধ্যে যত বেশী ধর্মীয় অচলায়তন বা যুক্তিহীনতা (লিঙ্গ বৈষম্য ও অন্যান্য অসহায়ত্ব বা রাষ্ট্রের দায়হীনতা) তত দূর্বল রাষ্ট্র।

 

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন দফায় দফায় পরিবর্তন হলেও হিন্দু পারিবারিক আইন কুইন ভিক্টোরিয়ারই³ জয়গান গাহিতেছে…

 

যে জনগোষ্ঠী নিজেই ধর্মের নামে তার নিজের নারী ও শিশুদের (এতিম) অসহায় ও পরনির্ভরশীল করে রাখে। ব্যাক্তি বা মানুষ হতে বাধা দেয়, তাকে আঘাত করার জন্য বাতাসই যথেষ্ট…

 

najib-tareque-socio-note-084

 

নোট:

১. আইন মেনে চলবার জন্য আইন জানা বোঝার জন্য পড়বার সক্ষমতা বা শিক্ষা (প্রাথমিক) জরুরী, তাই শিক্ষা (প্রাথমিক) রাষ্ট্রের দায়ীত্ব ও জনগনের দায়ীত্ব বা অধীকার…
আইন (তত্ত্ব) সমূহ  যদি মাতৃভাষায় লিখিত থাকে তবে জনগণের তা বুঝবার সক্ষমতার মাত্রা বহুগুণ থাকে এবং আইন প্রণয়নে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায়। উপনিবেশ বা দাস রাষ্ট্রে আইন তাই বিদেশি ভাষায় রচিত হয়। রাষ্ট্র প্রতিষ্টার আগে হিব্রু ভাষার বাইবেল ইউরোপের আইনগ্রন্থ… ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশে সংস্কৃত/ইংরেজি ভাষা কিংবা আরবি/ইংরেজি ভাষার ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে আইনসমূহ ফার্সি/ইংরেজি ভাষায়…

বিঃদ্রঃ আরবি কোরান ও ফার্সি হাদিস আরব-পারস্যকে পৃথিবী শাসনের ক্ষমতা দিয়েছিল। মাতৃভাষায় আইন প্রণয়নের সুযোগ ইউরোপের রাষ্ট্রসমূহকে পৃথিবীব্যাপী উপনিবেশ বিস্তারের ক্ষমতা দিয়েছে…

২. এর আগে শুধু কবির ছিল অধিকার কাব্য রচনার। গদ্য এর জন্ম ও বিকাশ একটি ‘রাষ্ট্র’ চেতনার প্রকাশ

৩. আমরা কি কুইন ভিক্টোরিয়ার শাসনাধীনে আছি?

 

নাজিব তারেক এর ব্লগ   ১২৬ বার পঠিত