ইমতিয়াজ মাহমুদ

এলান টুরিং

একটা বসন্ত বাউরি ডাকছে বাইরের গাছটাতে। ওর ফটো তুলতে যাবো? না, থাক। এই পাখিগুলি বড়ই শয়তান। খালি এইটা সেইটা আলাপ করতে চায়, আর উল্টাপাল্টা কথা বলে। থাক। বরং আজ একটু অফিসে যাই, অল্প স্বল্প কাজ করি, এরপর ফুলের ফটো প্রকল্প। এরপর এলান টুরিং এর জীবনী নিয়ে যে সিনেমাটা, দ্যা ইমিটেশন গেম, সেটা দেখবো। থাক বসন্ত বাউরি, তুই কামারের দোকানের হাতুড়ির মতো ঢুপ ঢুপ করে ডাকতে থাক- আমি যাই, এলান টুরিং ভাইজানের সাথে আমার আজকে ডেট।

এলান টুরিংএর কথা জানতাম না। ৫৭ ধারার মামলার পর কয়েকদিন একটা শেল্টারে ছিলাম। সেসময় আমার একজন বন্ধু বলছিলেন এলান টুরিংএর কথা। (বন্ধুর নাম বললাম না, কারণ তাতে করে আমার শেল্টারটা ফাঁস হয়ে যেতে পারে, আর বেচারা বন্ধুদের ঝামেলা হতে পারে।) আমি জানি, আজকের তরুণরা বেশীর ভাগই জানেন কে ছিলেন এই এলান টুরিং। গণিতজ্ঞ, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যাপারটা তিনিই সূচনা করেছেন। অসাধারান প্রতিভাবান এই লোকটা সমপ্রেমি ছিলেন। উনিশ বছর বয়সী যে বন্ধুটির সাথে তিনি একত্রে ব্যাস করতেন তার সাথে শারীরিক সম্পর্কের কারণে তাঁর সাজা হয়।

অসামান্য প্রতিভান এই মানুষটিকে আমাদের এই পৃথিবী বাঁচতে দেয়নি। সমপ্রেম ব্যাপারটাকে সেসময় একটা বিকৃতি আর সেই সাথে ব্যাধি বিবেচনা করা হতো। জেল থেকে তাঁকে কথিত চিকিৎসার জন্যে পাঠানো হয়। হরমোন টরমোন দিয়ে কিসব চিকিৎসার চেষ্টা নাকি তখন ছিল, উদ্দেশ্য সমপ্রেমি পুরুষটিকে শারীরিকভাবে নারীর প্রতি আকৃষ্ট করা। এইসব চিকিৎসায় আদৌ কোন ফল হতো কিনা জানিনা- চিকিৎসার নামে এইসব ইয়ের ফলে এলান টুরিং আর বেশীদিন বাঁচেননি। ১৯৫৪ সনে মাত্র বেয়াল্লিশ বছর বয়সে টুরিংএর মৃত্যু হয়।

(২)
সমপ্রেমিদের প্রতি আমার অপার মমতা। না, নৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে একজন ব্যক্তির ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত জিবনযাপরে যে স্বাধীনতা সেটার কারণেই যে কেবল এই মমতা তা কিন্তু নয়। আমি সমপ্রেমি যুবকদের দেখেছি, ওদের সাথে মিশেছি। কয়েকজনের সাথে আমার বেশ ভালো ঘনিষ্ঠতাও ছিল। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা কেবল বিজ্ঞান সমাজবিজ্ঞান দর্শন বা নীতিশাস্ত্রের ব্যাপার না। নিতান্ত মানবিকভাবেও যদি আপনি দেখেন, তাইলে আপনি সমপ্রেমকে মন্দ বলে নিন্দামন্দ করে ওদেরকে গালাগালি করতে পারবেন না।

কল্পনা করেন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ একটি ছেলের কথা। এই ছেলেটি মেয়েদের প্রতি কোন আকর্ষণ বোধ করেনা। মেয়েদের সাথে এমনিতে সে বেশ আন্তরিকভাবেই মিশতে পারে। মেয়েরাও ওকে বন্ধু হিসাবে বেশ পছন্দ করে এবং ওর সাথে একদম নিবিড় বন্ধুত্বও হয় মেয়েদের। কিন্তু শারীরিকভাবে মেয়েদের সঙ্গ তাকে উদ্দীপ্ত করে না। বরং সুদর্শন আকর্ষণীয় পুরুষদের দেখে যে আকৃষ্ট হয়।

সমাজ ওকে শিখিয়েছে এইটা মন্দ। সমাজ ওকে জানিয়ে দিয়েছে, কোন পুরুষের সাথে তুমি প্রেম কোর্টে পারবে না। পরিবার ওকে বলে দিয়েছে, পড়াশুনা শেষে ওকে বিবাহ করতে হবে একটি মেয়েকে আর অবশ্যই অবশ্যই সন্তান উৎপাদন করতে হবে। একটি মেয়েকে বিবাহ করতে হবে, একটি মেয়ের সাথে বিছানায় যেতে হবে এই চিন্তা তাকে আতঙ্কিত করে। কি হবে? এই কথা সে কাউকে বলতে পারে না। নিজে নিজেই কাঁদে গোপনে। ঈশ্বরকে অভিসম্পাত করে, আমাকে একন এরকম বানালে তুমি। নিজেকে ওর মনে হয় অস্বাভাবিক। কখনো কখনো মাথায় আসে ভয়ংকর সব চিন্তা- এই অস্বাভাবিক জীবন রেখে কি লাভ!

বিজ্ঞানীরাও কি সব বলছে আজকাল- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নাকি সমপ্রেমকে এখন আর ব্যাধি বিবেচনা করে না। এইসব কথা বাদই দিলাম। বিজ্ঞান কি বলে না বলে সেসব বাদ দেন। আমাকে কেবল এইটুকু বলেন, যে ছেলেটির কথা বললাম, সে কেন ওরই মতো আরেকজন পুরুষের সাথে তাঁর জীবন কাটাতে পারবে না। কেন সারা জীবন সে তাঁর পছন্দের একজন মানুষের সাথে বসবাস করতে পারবে না। সমাজে তাতে কি আসে যায়? আপনার তাতে কি ক্ষতি? দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ওদের নিজেদের শোবার ঘরে কি করলো না করলো তাতে আপনার কি? আপনার কোন বিশেষ অং তো আর ওরা ব্যাবহার করছে না আরকি।

(৩)
এক আমেরিকান যুবককে আমি চিনি। মধ্য তিরিশের এই যুবকটি দেখতে অসাধারণ রূপবান। প্রায় ছফুট ছিমছাম দেহ, গায়ের ত্বক চকচকে- নিখুঁত চোখ, ভুরু। লম্বাতে চেহারার উপর একটু দুষ্টামি মাখা মায়াভরা দুইটা টলটলে চোখ আর টুকটুকে গোলাপি ভেজা ভেজা ঠোট। আমার বাসায় যেদিন দাওয়াত খেটে এসেছে, একদম নিখুঁতভাবে ট্রিম করা চুল, স্লিম ফিট একটা কাটও টিশার্ট, কালো ট্রাউজার সাথে কালো জুতা। দেখতে পুরা একটা সিনেমার হিরো। যেসব ভাবীরা এসেছিলেন সেদিন পার্টিতে, ওদের সকলেরই চোখ যেন কতর থেকে বের হয়ে আসতে চায়- কে এই রূপবান যুবক!

মিষ্টিভাষী ছেলেটি কিছুক্ষণের মধ্যেই সকলের মন জয় করে নেয়। সবাই ওকে ঘিরে বসে গল্প করে। হা হা হি হি হই হই। আমার স্ত্রী এবং বন্ধুস্ত্রী যারা ছিলেন সকলেই কোন না কোন প্রসঙ্গে একবার নিজের নিজের বরের বদনাম করে। আমার প্রিয়তমা স্ত্রী আমার সম্পর্কে অনুযোগ করে- সংসারে কোন মন নাই, সে আছে ওর বই, ক্যামেরা আর ম্যাকবুক নিয়ে ইত্যাদি। সবাইকে চমকে দিয়ে যে যুবকও একই সুরে অনুযোগ শুরু করে, ‘ঠিক বলেছ জেনেফা, আমার স্বামীটিও একদম একইরকম, ঘোর সংসারে কি হচ্ছে না হচ্ছে…’ ইত্যাদি। সবাই চমকে ওঠে।

একী সামলাতে সামলাতে এক ভাবী ওকে প্রশ্ন করে, ‘ইয়োর হাজব্যান্ড?’
যুবক সহাস্যে ওর আঙ্গুলে হিরের আংটি দেখায়। হ্যাঁ আম্র হাজব্যান্ড, নিউ ইয়র্কের একটা ইউনিভার্সিটিতে ক্যামিস্ট্রির প্রফেসর। স্বভাব টভাব অনেকটা ইমতিয়াজের মতোই, ভোলা ভালা ইত্যাদি। কয়েকটি মিনিট মাত্র লাগে দ্বিধা কাটতে। এরপর পার্টিতে উপস্থিত সকল নারী ও পুরুষ স্বাভাবিক হয়ে আসে ছেলেটির সাথে। দুই একজন মহিলাকে দেখলাম আবার ঠারে ঠোরে ওর সাথে আলাপও করছে- কোন পুরুষটিকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় লাগছে।

এই যুবকটি আর ওর প্রফেসর সাহেব, ওরা কী কারো ক্ষতি করছে?

(৪)
আপনি অধিকারের দিক দিয়ে দেখেন। দুইজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ, ওদের ব্যাক্তিগত জীবনে কি করবে না করবে সেই অধিকার কি ওদের নাই। আপনারা যারা চোট করে যে কোন কারণেই মানুষের অধিকার হরণের পক্ষে, আপনারাই বলুন, কি ক্ষতি হয় দুইজন পুরুষ যদি নিজেদের মধ্যে ভালবাসাবাসি করে, একত্রে ঘর বাঁধে? আপনার তো কোন ক্ষতি করছে না ওরা।
ঐ যে কাল্পনিক সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ ছেলেটির কথা বললাম- সেই ছেলেটি যে যন্ত্রণায় ভুগছে, প্রায়ই নিজের প্রাণ হরণের কথা ভাবছে, নিজেকে নোংরা অপাক্তেয় ভাবছে, সে তো কেবল আপনাদের এইরকম আচরণের জন্যে- ইংরেজ সমাজ বিলেতে যেটা করেছে এলান টুরিংএর সাথে।

শুনেছি এলান টুরিংএর মৃত্যুর অনেক পরে ব্রিটিশ সরকার নাকী ওর সাজা মওকুফ করেছে, ওর প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। ভাল কথা। মন্দের ভালো। ইংরেজদের বোধোদয় হয়েছে। আপনারাও ভেবে দেখেন, মানুষের প্রতি যদি মানুষ হিসাবে আমরা খানিকটা সম্মানও দেখাতে না পারি, তাইলে আমরা কিসের মানুষ। কেন আমরা ওদেরকে হেনস্থা করবো তাকে, প্রেমের ব্যাপারে যাদের পছন্দ আমাদের সাথে মেলে না? সবাইকে যার যার মতো বাঁচতে দিই।