“খানকির পোলা দরজা খুল।”

দাম দাম করে দুরমুশের মত বাড়ি পড়ছে, জহির তখন সেভেন স্টার ব্লেড দিয়ে মাত্র এক গাল শেভ করেছে।জহির, ভড়কে গিয়ে গামছা দিয়েই অন্য গাল টা মুছে নিয়ে দরজার দিকে ছুটে গেলো। দরজায় তখন ইট ভাঙ্গার মত বাড়ি পড়ছে।

ভাই। খুলি খুলি বলে ছিটকিনি দিয়ে দরজা খুলতে না খুলতেই চার পাঁচ জন যুবক, ফিল্মের স্টাইল এ এক ধাক্কায় জহির কে মাটি তে ফেলে তার গলা চেপে ধরল, তোর নাম জহির ?

এবং কোন উত্তর শোনার আগেই, আরেকজন একটা জুতার হিল দিয়ে, তার গালে চেপে ধরে। জহির হাস ফাঁস ফেলতে ফেলতে কোন মত বলল, আপনারা কারা?

চুপ, কোন কথা বলবি না।

কেও একজন একটা পাসপোর্ট সাইজ এর ছবি, উলটো করে জহির এর মুখে চাপ দিয়ে বলল, বস চেহারা একদম মিলে গ্যাছে।

– দাড়া। ভাল করে দেখে নেই। বলে একজন একটা কিক মারল জহির এর কানে।

রক্ত গড়িয়ে জহির এর ঠোঁটে নোনতা স্বাদ লাগলো। কিন্তু কোন ব্যাথা পেল না জহির তীব্র ভয়ে।

জহির কিছু একটা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু হিলটা তার গাল এ চেপে থাকাতে সে কথাই বলতে পারছেনা। কিন্তু তবু হাত পা দিয়ে তড়পাচ্ছিল জহির। তলপেটে একটা তীব্র একটা ব্যাথা অনুভব করল জহির, জুতার আগা দিয়ে একটা শক্ত কিকের ।

-হাতটা পিছে বান, যাতে পলাইতে না পারে। চেহারা মিলে গেছে, এই বেটাই।

হিলওয়ালা তার পা একটু লুজ করলে জহির হাউ মাউ করে বলে ওঠে

– স্যার, আপনারা কারা? আমি কী করছি? আমি কিচ্ছু করি নাই।

আপনেরা কারা।

কালো শুকনা একটা লোক তার কানে বলল, পাছায় ডিমটা ঢুকাইলেই জানতে পারবি।

মাটি থেকে হেঁচকা টানে দাঁড়িয়ে শক্ত করে হাত আর চোখ পিছু দিয়ে বাধল কালো লোকটা। জহির সেই চোখ বন্ধ অবস্থায় আবার বলল

– স্যার আপনেরা কারা।

দাঁড়ানো অবস্থায়, কেউ একজন জহিরের দু্ই পায়ের মাঝখানে জুতার ডগা দিয়ে তীব্র কিক দিল। কুঁকড়ে মাটিতে শুয়ে পড়ল আবার জহির।

– সার্চ দে।

জহির শুনতে পেল কেউ একজন তার রুম তছনছ করছে। মেস এর শেষ সীমানায় টিন এর চাল এর রুম। তাতে শুধুমাত্র একটা খাট। একটা প্লাস্টিক এর আলনা। আর একটা কেরোসিনের চুলা।

– বস। এইটা ফকিরা পার্টি।

চল। চোখ বাধা অবস্থায় অকস্মাৎ একটা হেঁচকা টানে ছেঁচড়ে রুম থেকে বের করলো জহিরকে কেউ একজন। মাত্র একমিনিটে এসব হয়ে গেল।

চোখ বাধা অবস্থায় জহির শুনতে পেল, মেস এর প্যাসেজ দিয়ে তাকে ছেঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যে সব প্রতিবেশীদের পদশব্দ আর হুশ হাস।

– সর সর।

জহির শুনতে পেল মেসের কমন কাজ এর মেয়েটার তীব্র কণ্ঠ, আপনেরা কারা? উনারে কই নিয়া জান? উনি কী করছে?

– চুপ, খাঙ্কি! আমরা এন,এস,আই। এই শূয়োরের বাচ্চা হরতাল এর সময় বাসে বোমা মেরে মানুষ মারছে। কিন্তু তুই জিগাইবার কে। একদম হান্দায়া দিব।

জহির, সম্বিত ফিরে পায়। এতোক্ষণে তাকে গাড়িতে তোলা হয়েছে।

গাড়ীতে বসে জহির নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে।

সে জহিরুল আলম। ঐরাবতি টেইলর এর কাটিং মাস্টার। বয়স ২৮। ঢাকায় এসেছে ১৫ বছর বয়সে। গার্মেন্টস-এর কাজ শিখে গত তিনবছর ধরে বুটিকে ঢুকেছে কাটিং মাস্টার হিসেবে। তার এমন কোন বন্ধু নাই, শত্রু নাই। কোন রাজনৈতিক দলের কোন নেতা এর সাথে তার খাতির নাই, কেউ তারে কোন দিন পুছেও নাই। সে নামাজও শিখে নাই, কারণ তার সৎ বাবা ছোটকাল থেকেই তারে দিয়ে গৃহস্থালী খাটাইছে। কোন মৌলবি মৌলানার সাথে তার খাতির নাই যে, কেও তারে মৌলবাদী সন্ত্রাসী বলবে।

তার একটাই পরিচয়, সে ঐরাবতি টেইলর এর কাটিং মাস্টার।

তার বাপ নাই। ভাই বোন নাই। মা তার খবর নেয় না, সেও মা এর খবর নেয় না। তার কোন প্রেম নাই — না আছে। একটা মেয়েরে সে প্রেম করছিল।

কিন্তু ওই মেয়ের তো তিন বছর আগে বিয়া হয়ে গেছে।

তার কোন শত্রু নাই। সে বুঝতে পারেনা। কেন এন,এস,আই তাকে বাসে বোমা মারার মত অপরাধে নিয়া যাবে? সে চিন্তা করতে থাকে, এমন কেউ কী আছে যাকে এ সে কল করলে তাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে?

চিন্তা করে কাউকে খুঁজে পায় না জহির। সে প্রথম জেনারেশনে ঢাকায় আসা লোক। তার পূর্বপুরুষেরা, তার পিতা, সৎ পিতা, চাচারা, ফুফুরা সবাই গ্রামে গিরস্তি করে। তার কিছু আত্মীয় ঢাকায় এসে রিকশা চালায়। গার্মেন্টস এ কাজ করে। এদের মধ্যে বরং সেই ভাল করছে। সে আজ ঐরাবতি টেইলর এর কাটিং মাস্টার। ১২ হাজার টাকা বেতন পায়।

কিন্তু এন,এস,আই এসে তার খোজ খবর করবে এমন কেউ তার এই দুনিয়াতে নাই।

নিশ্চয় কোথাও ভুল হচ্ছে।

গাড়ি থামে। গাড়ি থেকে নামার সময় মাটি কোথায় বুঝতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পরে যায় জহির। এরপর তাকে একটা ঠাণ্ডা রুমের ফ্লোর এ বসিয়ে রাখে ওরা। দেয়ালে পিঠ দিয়ে ভাবতে থাকে জহির তার ভাগ্যে এখন কী আছে।

না তার একজন ছিল। সাবেরা ছিল। সাবেরা। তার সাথে একই গার্মেন্টস এ কাজ করত। জহির তখন কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর। সাবেরা ছিল তার মত বৈশিষ্ট্যহীন, রূপহীন, ছোটখাট গড়নের একজন সুইং অপারেটর। কত ফ্লোর সুপারভাইজার কত মেয়ের সাথে কত ভাব করার চেষ্টা করে, জহির কখনো কাউকে পাত্তা দেয় নাই। সে জানে কত সহজেই একএক জনকে ধরা যায়। ফ্লোর এ সহজ কাজটা দিয়ে সুন্দরী অপারেটরদের অফিস এর শেষে হোটেলে নিয়ে যাওয়াটাও খুব কঠিন কোন কাজ না। যারা পারে, তারা পারে।

কিন্তু জহির কখনই কারো দিকে তাকায় নাই। কিন্তু একটা বৈশিষ্ট্যহীন সাবেরা এর সাথে তার মন দেয়া নেয়া হয়। তারা ছুটির দিন ফার্মগেট এর ব্রিজে উঠে চানাচুর খেত। তারা ঠিক করে, তারা একদিন গার্মেন্টস ছেড়ে একটা টেইলর এর দোকান দিবে। সাবেরা বলছিল তাকে শীতলক্ষার পাড়ে শান্তিপুর গঞ্জের কথা। ওইখানে নাকী কোন ভাল টেইলর নাই। নদীর পারে বাজার। ৫০,০০০ টাকা সালামি দিয়ে তারা গঞ্জেই একটা দোকান নিতে পারবে। গঞ্জে অনেক লোক এর আসা যাওয়া। অর্ডার এর অভাব হবে না। জহির কাটিং করবে, সাবেরা সেলাই করবে। ওরা প্লান করেছিল প্রতিটা লেডিস থ্রি পিচ ৩০০ টাকায় বানিয়ে দিবে। প্রতিদিন যদি ৩ টাও করে তো মাসে ২২,০০০ টাকা দুই জনের আরামে দিন চলে যাবে।

ওইটা হলে তাদের আর মেশিনে একটানা ১০ ঘণ্টা কাজ করতে হবেনা। দুপুরে জামাই বউ হোটেলে একসাথে রান্না করে খাবে। আর রাতে রান্না করবে। কারণ দিনের আলো থাকতে কাজ করলে যে কামাই, রান্না বাজার করতে গিয়ে তার থেকে বেশি সময় নষ্ট হবে। ৪৮০০০ টাকা পর্যন্ত জমিয়েছিল জহির যখন সাবেরার বিয়ে হয়ে গেলো।

সাবেরা আর তার স্বপ্নের মিলন হয়নি। হয়নি নদীর পারে, বাজারে তাদের টেইলর এর দোকান দেয়া। সাবেরার ভাই রাজি হয়নাই, গার্মেন্টস এর কোয়ালিটি কন্ট্রোলারের কাছে তার বইনকে বিয়ে দিতে।

প্রথমে সমস্যা ছিলনা। সাবেরাদের পরিবার তার মতই গ্রাম থেকে উঠে আসা। কিন্তু টাকা পয়সা খাটিয়ে সাবেরার ভাই কেমনে যেন পুলিশে ঢুকে যায়। এবং মাত্র চারমাসে তাদের পরিবার টাকা পয়সা বানিয়ে ফেলে। সাবেরা গার্মেন্টস ছেড়ে দেয়।

জহির, চিন্তা করে মনে করতে পারে না। সাবেরার ভাই কিসে ঢুকেছিল। র‍্যাব নাকি পুলিশ নাকি বিডিআর নাকি অন্য কিছু।

ঠিক মনে পড়েনা। মাথা থেকে বেয়ে আসা রক্ত, তার গাল এ জড়িয়ে থাকে। সে অনুভব করে, তার হাতের রশি খুলে দেয়া হচ্ছে। তার চোখের বাধন খুলে দেয় কেউ একজন। তীব্র আলোতে তার চোখ ধাধিয়ে যায়। একটা লম্বা কাল লোক। কী কর্কশ তার হাত!

চল তরে বস এ ডাকছে। তর পাছায় একটা ডিম হান্দাইব আজকা। সত্যি কথা বললেও, ডিম দিব, মিথ্যা বললেও ডিম দিব। কিন্তু যদি পরথমবার এই সত্যি কথা বলোস, তাইলে সিগারেটে দিয়া ছ্যাঁক দিমু না। খেয়াল রাখিস।

ঢুলতে ঢুলতে জহির ঢোকে একটা রুমে। ঠিক হিন্দি সিনেমার মত একটা রুম। মাঝখানে একটা টেবিল। একটাই দরজা আর ছাদ এর কাছে জেলখানার মত দুইটা ছোট জানালা। আলো ঢোকে না। অল্প ওয়াট এর টিউব লাইট এর দুইটা বাতি জলতাছে।

সিলিং এর হুক থেকে দুইটা রশি ঝুলানো। কোন বাসায় জহির কখনও এভাবে ঝুলানো হুক দেখে নাই। এইটা মিস্ত্রি দিয়ে স্পেশিয়ালভাবে বানানো। কয় একটা অদ্ভুত ডিজাইন এর লোহার টুকরা। আর কি কি। দেখে বুঝা যাই এইগুলো ভয়ঙ্কর কিছু কিন্তু কেমনে এইগুলো ব্যবহার হবে দেখে বুঝতে পারেনা সে। ভয় এ জহির এর রক্ত হিম হয়ে আসে। ব্যথা ভুলে যায়।

টেবিল এ একজন লোক বসে। মুখে সিগারেট। লোকটার বয়স ৩০ এর বেশি নয়। ছোট খাটো। বোঝা যাচ্ছে এই লোকটাই বস। তার সামনে আর একটা লোক। তার বয়স ৪৫ হবে। বিশাল বড় শরীর, সাথে বড় ভুরি। অল্প চুল। জহির এর ধারণা ছিল পুলিশ, এনএসআই, র‌্যাব এর সবাই উর্দি পরে। কিন্তু এখানে কেউ উর্দি পরে নাই।

লম্বা লোকটা তাকে সিলিং এর হুক এ বাধা একটা রশির সাথে বেধে, টান দিয়ে হাত উপরে তুলে দেয়।

বস টাইপের লোকটা বলে, জুনু আমার টাইম নাই। দুইডা বাড়ি দে। অল্প টাইম এ কথা বাহির করতে হবে। মিছা কথা শুননের টাইম নাই।

যেই লম্বা কালো লোকটা তাকে নিয়ে এসেছিল। সে তার প্যান্টটা খুলে নেয়। আর জুনু নাম এর লোকটা একটা লম্বা চিকন কঞ্চি দিয়ে তার নগ্ন পাছায় সর্বশক্তিতে বাড়ি দিতে থাকে।

চিৎকার এ বিদীর্ণ হয়ে ওঠে রুম। আল্লা, আল্লা, মারে, এমনকী যে বাবাকে কখনো সে দেখে নাই সেই আব্বা, মক্তবে গিয়ে ধর্ম শিক্ষা না নেয়াতে যেই খোদা ভক্তি তার মনে আসে নাই সেই খোদার নাম ধরে চিৎকার করে সে ডাক দিতে থাকে। সে চিৎকার করতে করতে চিন্তা করে, এরা তাকে কোন প্রশ্ন করলো না। কেন তাকে মারছে। প্রশ্ন করুক। সে সব সত্য বলবে। তার তো মিথ্যা বলার কিছু নাই।

তীব্র ব্যথায় জহির এর সারা শরীর আগুনের মত ঝলসাতে থাকে।

– স্যার, মাফ কইরা দেন। মাফ কইরা দেন।

তার ইচ্ছা হয় শরীরটা গুটিয়ে লোকগুলোর পায়ে জরিয়ে সে মাফ চায়। ক্ষমা ভিক্ষা চায় তার না জানা অপরাধ এর জন্যে।

পুরাই পাঁচ মিনিট পর ক্ষান্ত হয় জুনু নাম এর অসুরটি।

ছোটখাটো গড়নের লোকটা, যাকে বাকি দুইজন বস বলে ডাকছে উঠে এসে জহির এর সামনে এসে দাঁড়ায়। জহির এর মনে হয় ব্যথায় সে অজ্ঞান হয়ে যাবে।

বস বলে।

– আল্লার কসম তরে আমি একটা কথা দুইবার কমু না। সব কথা একবারে উত্তর দিবি।

– স্যার আল্লার কসম আমি কিছু করি নাই। আমি জানি না, আপনেরা কেন আমারে আনছেন।

– হ। তুমি দুধের বাচ্চা। আমার লগে এক্টিং করো?

সিলিং এ ঝুলন্ত অবস্থায় জহির ব্যাথায় কুচকে বস এর দিকে দিকে তাকিয়ে থাকে। বস এর তার মতই বৈশিষ্ট্যহীন চেহারা। ছোট করে কাটা চুল। তার মতই বয়স। ফুল হাতা শার্ট কিন্তু হাতা গুটানো ।

বস একটা জিনিস তার সামনে এনে বলে, এইটা কী। জহির ভাল করে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে। তার যুক্তি বুদ্ধি কিছু কাজ করেনা। ঝাপসা দেখে। কিন্তু তবু তার সব মনসংযোগ এক করে সে তাকায়।

– মানিব্যাগ স্যার, এইটা একটা মানিব্যাগ।

– এইটা কার মানিব্যাগ ?

কেমনে জানবে জহির একটা কার মানিব্যাগ।

– জানি না স্যার।

জহির তার পাছায় জ্বলন্ত কিছু একটা ঢোকার তীব্র জান্তব যন্ত্রণা অনুভব করে। চিৎকার দিয়ে ওঠে স্যার বলতেছি বলতেছি।

বস বলে, এক প্রশ্নের এক কথায় উত্তর দিবি।

জহির বলে জি স্যার। জি স্যার।

আর তীব্র ব্যাথায় কাতরাতে থাকে।

আবার বলে লোকটা বল এইটা কার মানিব্যাগ। জহির জানে না সে কী উত্তর দিবে। সে এই প্রশ্নের উত্তর না দিলেই তারা একটা জ্বলন্ত সিগারেট এ পাছায় ঢুকিয়ে দিবে।

সে নিশ্চুপ থাকে।

লোকটা এবার বলে। এই মানিব্যাগ এ এটা তর ছবি, ঠিক না?

ধপ করে, জহির এর মাথায় আলো জেলে ওঠে। এইটা তো তারই মানিব্যাগ। এই মানিব্যাগ সে হারাইছে, তিনমাস আগে। সে এইটা মনে করতে পেরে আনন্দে আর ব্যথায় চিৎকার দিয়ে ওঠে। যেন এই প্রশ্নের উত্তরেই তার মুক্তি।

– স্যার স্যার স্যার এইটা আমার মানিব্যাগ। আমি এইটা ঈদ এর চাঁন্দ এর রাইতে, গাবতলিতে হারাইছি।

– জুনু। তোরা কেন আমার টাইম নষ্ট করতেছস।

জহির এর চিৎকারে বিদীর্ণ হয়ে ওঠে ছোট্ট রুম। ধ্বনির সাথে প্রতিধ্বনি মিশে যায়।

তীব্র ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে পরে জহির। জ্ঞান ফিরলে সে দেখে, তাকে ঘিরে তিনজন।

ওরা কিছু বলার আগেই বলে, স্যার। আমি একটা টেইলার মাস্টার। আমি জীবনে কোনদিন খারাপ কাজ করি নাই। এই মানিব্যাগ আমার কিন্তু আমি জানিনা, আপনারা কেন আমারে পিডাইতাসেন। এইডা আমি চান রাইতে গাবতলি বাস স্ট্যান্ডে হারাইছি।

বস কথা বলে।

– জি ডি করছিলি?

– না স্যার। জি ডি কী জিনিস?

তুই জানোস কাল পল্টনে, একটা বাস এ আগুনে তিনটা লোক মরছে?

– জানিনা স্যার। আমি এইসব খোজ খবর রাখিনা স্যার। আমার রাখনের কাম নাই। আমি ঐরাবতি টেইলর এর কাটিং মাস্টার।

– তুই জানোস, ওই আগুনে তিনটা লোক মরছে?

– জানিনা স্যার। আমি পেপার পড়ি না।

– তুই জানোস, যেইখানে আগুন পড়ছে ওইখানে তর এই মানিব্যাগ পাওয়া গেছে।

– স্যার, আমি এই মানিব্যাগ তিনমাস আগে হারাইছি। আমি কিছু জানিনা স্যার। আপনারা আমার মেস এ খোজ নেন। আমার মালিকরে জিগান। আমি গরিব মানুষ। আমি তিনবছর ধরে ঐরাবতি টেইলরে শুক্কুরবারেও কাম করি। আমি কেমনে জানুম স্যার। আমার মালিকরে জিগান। আমি কাইলকাও সারাদিন কাম করছি।

এমনসময় দরজা খুলে একজন সুবেশী অফিসার ঢুকে। সবাই সতর্ক হয়ে দাঁড়ায়। জায়গা করে দেয়।

অফিসার জহিরকে পাত্তাও দেয় না। যেন জহির ওইখানে নাই। যেন অফিসার, মর্গের পোস্ট মরটেম এর ডাক্তার। পড়ে থাকা লাশ এর দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।

এদিকে আস বলে, অফিসার তিনজনকে দূরে নিয়ে আসে যাতে জহির তাদের কথা শুনতে না পারে।

অফিসার জিজ্ঞেস করে।

কয়জনরে ধরছো।

– দুই টা স্যার।

– কোন লিঙ্ক পাইছো?

– স্যার একটারে ধরছি বাস এর পাশে পাওয়া মানিব্যাগ এর লিঙ্ক ধরে। আর বেক আপ হিসেবে একটা হিরোইনচি ধরে রাখছি।

– কোন স্টেটমেন্ট পাইছো?

– না স্যার এখনো স্বীকার যায় নাই।

– আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে স্টেটমেন্ট চাই। আমাকে হোম মিনিস্ট্রি থেকে ফোন দিসে। ১২টায় প্রেস কনফারেন্স। আমাদের কেও রে না কেও রে সামনে আনতেই হবে। এমন একটারে ধরবা যার কোন বেইল নাই। কোন পলিটিকাল কানেকশান নাই। গ্রাম থেকে আসা গার্মেন্টস এ কাজ করে বা রিকশাওয়ালা বা মিসকিন এই টাইপ এর কেউ হলে ভাল হয় ।

– এইটা কোন টা?

এই প্রথম অফিসার জহির এর দিকে তাকায়।

– স্যার, এইটারে মানিব্যাগ এর লিঙ্ক ধরে পাইছি।

– কী করে?

– টেইলর এর দোকানে সিলাই করে।

– গুড। এইটা ঠিক আছে। এইটার পলিটিকাল কানেকশান আছে নাকী একটু শিওর হও। ইদানিং ফকিরনির পুতদেরও পলিটিকাল লিঙ্ক থাকে। পলিটিকাল বাদে অন্য কোন লিঙ্ক থাকলে পাত্তা দিওনা।

অফিসার জহির এর ঝোলানো নেতিয়ে পরা শরীরটা দেখে।

– হিরইঞ্চি থেকে আমার কাছে এইটা স্যুইটেবল মনে হচ্ছে। কিন্তু এই ধরনের কেস এ হিরইঞ্চি টিরুইঞ্চি রিস্কি। সাংবাদিকরা বুঝে ফেলে। আমি এইটারে প্রেফার করবো।

সময় কিন্তু বেশি নাই। তুমি এইটারে ইনটারগেট করে বুঝে দেখ। প্রেস কনফারেন্সে তুমি আমার পাশেই থাকবা। কাল সব পেপারে এইটা ছাপা হবে। আমরা যদি দেখাতে পারি, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমরা আসামীদের গ্রেপ্তার করতে পারছি- হোম মিনিস্টার নিজে আমাদের এওয়ার্ড দিবে। ভাল করেই তুমি বুঝতাস এইটা কত ক্রিটিকাল। একটা স্টেটমেন্ট আদায় কর। তোমার হাতে সময় দুই ঘণ্টা।

গুবলেট কইরো না।

– ওকে স্যার।

অফিসার বেরিয়ে যান।

বস, জুনুকে বলে।

– আমি একটা টেকনিক চিন্তা করছি।

জুনু আর বস জহির এর কাছে আসে।

বস বলে।

– শোন। এখন যে আইছিল সে আমার বস। তার মধ্যে দয়া হইসে। সে কইসে তরে ছাইরা দিতে। কিন্তু তরে এমন একজন এর কাছে ছাড়বো যারে সবাই মান্য গণ্য করে।

– এমন কেও রে তুই চিনোস?

জহির এর কাছে কথাগুলো দেবদূতের বাণীর মত শোনায়।

– না স্যার। আমি গরিব মানুষ। আমার সেইরকম কোন চিনা জানা নাই।

– তর ভাই ব্রাদার কেউ আছে ?

– কেও নাই।

– মা ?

– জানিনা কই আছে।

– বাপ ?

– মইরা গ্যাসে।

– তর গ্রাম এর কোন মেম্বার টেম্বার, চেয়ারম্যান? যেইহানে থাকস ওই হানের ওয়ার্ড কমিশনার?

স্যার। আমি ৩ বছর হইল গ্রাম এ যাইনা। এলাকার কাউরে চিনি না। আমি কামে যাই। কাম থেকে ফিরি। সপ্তাহে সাত দিন।

বস এর চোখ আনন্দে চিক চিক করে উঠে।

– সত্যি কইরা বল। এহন কেউ আসলেই, আমরা তরে ছাইড়া দিমু।

নাই স্যার।

– সাংবাদিক ফ্রেন্ড ট্রেন্ড নাই তো? এখন তো পাড়ার নেড়ি কুত্তাও সাংবাদিক বেজ লাগাই ঘুরে।

– না স্যার। আমি জীবনে কোন সাংবাদিক এর লগে কথা বলি নাই। ঢাকায় আইসা আমি দশবছর কাজ করছি গার্মেন্টস এ, তারপর আমি ঐরাবতি টেইলর এর কাটিং মাস্টার। কোন সাংবাদিক এর লগে পরিচয় নাই।

– আর্মি পুলিশ র‌্যাব এ কেউ নাই? ভাই ব্রাদার। চাচাত ফুপাত ভাই।

– জহির না বলতে গিয়েও একটু চিন্তা করে। না। একটা লোককে সে তো চিনে। সাবেরার ভাই। তিনবছর আগে যখন সাবেরাকে, ওরা ওর জীবন থেকে ছিনিয়ে নেয়। তখন সাবেরার ভাই তাকে ফোনে দিসিল। ওই লোক সরকারী কোন বাহিনীতেই ছিল। আর্মি না পুলিশ না র‌্যাব না ডিবি আর তার মনে নাই। কিন্তু এইরকম কিছু একটা ছিল।

ওই লোক তাকে ফোনে দিছিল। খুব ভদ্দরলোক ছিল। বি,এ পাশ। লোকটা তারে ফোন করে অনেক বুঝাইসে। সাবেরার ভাই বলছিল, সে যদি সাবেরাকে বিয়ে না করে, তো সাবেরা একটা ভাল জীবন পাবে। ও তো সাবেরার ভালোই চায়। সাবেরাকে যদি সে ভালোবাসে তো সে কেন সে সাবেরার জীবন এর বাধা হবে।

সাবেরা এর জন্যে যে পাত্র তারা ঠিক করছিল, সেই পাত্র বিদেশে থাকে। ভালো ফ্যামিলি। সাবেরাকে ৫ ভরি গহনা দিবে। দক্ষিণখানে নিজস্ব বাড়ি। জহির সাবেরাকে কী দিতে পারবে। এমনকী, সাবেরার ভাই তাকে বলছিল তাকে ৫০,০০০ টাকা দিয়ে একটা দোকান করে দিবে, তবুও যেন সে সাবেরাকে বোঝায়। জহির সাবেরাকে এমনিতেই বুঝাইসে টাকা নেয় নাই।

সাবেরা বলছিল সে জহিরকে বিয়া করতে না পারলে বিষ খাবে।

জহির সাবেরাকে বোঝায়। সাবেরার ভাই এর কথা তার কাছে ঠিক মনে হইছিল।

আসলে সে কী? সে একটা গার্মেন্টস এর কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর। তাও সাব কন্ট্রাক্টের গার্মেন্টস।

কিন্তু সেটা তো তিনবছর আগের কথা। জহির এর মনে হল। আজ তার জীবনের ঘোর বিপদ। আজ সে সাবেরার ভাই এর হেল্প চাইতেই পারে।

জহির এর নীরবতা দেখে লোকটা খেঁকিয়ে উঠে।

এই খানকির পোলা। কথা কস না কেন?

জহির উদ্ভাসিত মুখে বলে। আমি একজনকে চিনি।

বস এর মুখ এক নিমিষেই চুপসে ওঠে, জহির দেখতে পায় না।

– কে ?

– আমারে একটা মোবাইল দেন।

– জুনু এরে তর মোবাইলটা দে।

জুনু সিলিং থেকে রশি খুলে জহিরকে নামায়। তার মোবাইলটা বাড়িয়ে দেয় জহির এর দিকে।

হটাৎ যেন, দৃশ্যপট পালটে যায়। টেনশনে বস এর ঘাম ঝরতে থাকে। সে স্বপ্নে দেখা শুরু করেছিল, সব পেপারে পেপারে তার ছবি, সাব ইন্সপেক্টর শহিদ এর হাতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পেট্রোল বোমার আঘাতে তিনজন মৃত্যু ঘটনার আসামী গ্রেফতার ও স্বীকারোক্তি। এমন সুযোগ ক্যারিয়ারে একবার আসে। সে মানস চোখে দেখতে পারে, কাল পেপার থেকে তার ছবি মুছে যাচ্ছে।

কাল রাতে সোর্স যে খবর দিছে সেই অনুসারে এই খাঙ্কির কোন লিঙ্ক থাকার কথা না।

তবুও সে সতর্ক হয়ে বুঝতে চায়।

জহির এর কাছে সাবেরার নাম্বার মুখস্থ। গত তিনবছরে প্রায় প্রতি মাসে সে সাবেরাকে একবার না একবার বিভিন্ন ফোন ফ্যাক্স এর দোকান থেকে ফোনে দিসে। সাবেরা হ্যালো হ্যালো বলে কিন্তু সে শুধু তার গলাটা, ১৫ সেকেন্ড এর জন্যে শুনে ফোনটা রেখে দেয়। গত তিনবছরে সাবেরা দুই রিং এর উপরে কখনও ফোনে ধরে নাই। যেন সে, তিনবছর ধরে মোবাইলটা হাত থেকে ছেড়ে নাই। কিন্তু কখনো সে কোন নাম্বার এ কল ব্যাকও করে নাই।

জহির, জুনু এর ফোনটা দিয়ে ফোনে করে সাবেরাকে। দুই রিই এই সাবেরা ফোন ধরে। বলে হ্যালো কে বলতাছেন?

আমি জহির।

সে ঐ সাইড এ একটা গোঙ্গানির এর শব্দ পায়। কিন্তু এখন রোমান্সের সময় নাই।

সে একটানে বলে, শুনো। আমি একটা বিপদে পরছি। তোমার ভাই এর নাম্বারটা আমারে এই নাম্বার এ এসএমএস কর। আমি তোমারে পরে বুঝিয়ে বলবো।

সাবেরা শুধু বলে। আচ্ছা।

ফোন রেখে দেয় জহির।

টুং টুং করে জুনু এর নাম্বার এ এসএমএস আসে ৫ সেকেন্ড এর মধ্যে।

রাগ এ বস এর মুখ বিকৃত হয়ে আসে।

কার লগে কথা বললি। ফকিরনির পুত তুই আবার কোন প্রাইম মিনিস্টার এর দোস্ত লাগোস?

– আমারে আর একটা কল দিতে হবে। আগেরটা দিয়া শুধু নাম্বারটা নিছি।

বিরক্তিতে মাথা নেড়ে বস বলে –

কল দে। একটা মাত্র কল দিতে পারবি। নাইলে তোরে ছারুম না। একটা মাত্র কল।

জহির মনে মনে আল্লাকে ডাকে। যেন সাবেরার ভাই তার ফোনটা ধরে। সাবেরার দেয়া নাম্বারটা নিয়ে জুনুর মোবাইল থেকে কল দেয়।

কিন্তু অসময়ে টেবিল এর উপরে বস এর ফোনটা বেজে ওঠে আর বস প্রচণ্ড বিরক্ত হয়।

ফোনটা হাতে নিয়ে বস চিন্তা করে চুতমারানির এই আন টাইমে কে ফোন দেয় আমারে?

অন্যদিকে জহির এর ফোনে কানেকশানটা লেগে যায়।

সে বলে, হ্যালো।

এনালগ থেকে ডিজিটাল কনভারসন হয়ে মোবাইল কোম্পানির সার্ভার থেকে সুইচ বেয়ে টাওয়ার থেকে টাওয়ারে ঘুরে তার সে হ্যালো ফিরে আসে ওই নিঃশব্দ রুমে ।

একটা পারমানবিক বোমার মত বস এর কানে বিস্ফোরিত হয় জহির এর কণ্ঠে

হ্যালো।

 

জিয়া হাসান এর ব্লগ   ৫১৫ বার পঠিত