Avatar

সেদিন ইউনিভার্সিটি যাচ্ছি। ট্রেনের শেষের কামরায় বসে। অনেক কষ্টে যায়গা পেয়েছি একটা। চারজনের সিটে ছয়জন বসে। ডেইলি প্যাসেঞ্জাররা এত জোরে জোরে চিৎকার করে গল্প করছে যে বোঝার উপায় নেই সেটা গল্প না ঝগড়া। রাজনীতি থেকে পর্ণো (ওদের ভাষায় পানু) কোনও কিছুই বাদ যাচ্ছে না ওদের আলোচনায়। আরও একটা মজার ঘটনা ঘটছে, আলোচনায় প্রবেশ করতে না করতেই প্রসঙ্গ পাল্টে যাচ্ছে। অনেকটা বাচ্চাদের হাতে টিভির রিমোট দিলে যা হয়, ঠিক তেমনভাবেই। মনটা বারবার ওদিকে চলে যাচ্ছে, যদিও ভাব এমন দেখাচ্ছি যেন ওদের দিকে পাত্তাই দিচ্ছি না। আচমকা একটা খুব কমন টপিকে এক মোমিন ডেলিপ্যাসেঞ্জার বলে উঠলো, “ও আবার আসল মুসলমান নাকি? শালা কাফের দেশে কাফের মন্ত্রী! নামাযের পোজে ছবি তুললে আর ইফতারি দিলেই মুসলিম হয়ে যায় না!

যাই হোক, কিছুক্ষণের মধ্যেই টপিক আবার পাল্টে গেলো। কিন্তু আমার মন থেকে প্রশ্নটা তো গেলোই না, উলটে বেড়ে গেলো আরও। বারবার একটাই কথা কানে ভাসছিল—তাহলে প্রকৃত মুসলমান কে? কি হলে আসল মুসলমান হয়?

যাই হোক ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরলাম। খাওয়া-দাওয়া করলাম করে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবছি যে কোন বইটা নিয়ে শুতে যাবো। বুক-সেলফ এর সামনে দাঁড়িয়ে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়েই এ-বই সে-বই নাড়াচাড়া করছি। খেয়ালও করি নি কোন বইটা নিয়ে নাড়ছি, মনে সেই একটাই প্রশ্নঃ কে আসল মুসলমান, আর কে নয়? শেষে নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে নেব ঠিক করে ডায়েরিটা তুলে নিলাম বইটা রেখে, তখন প্রথমবার খেয়াল করলাম, যে বইটা এতক্ষণ হাতে ছিল সেটা “ভারতীয় শক্তিসাধনা – ১ম খণ্ড”।

ডায়েরিটা নিয়ে শুয়ে পড়লাম। একটা আঁচড় ও কাটতে পারি নি। জানি তো অনেক কিছুই, কিন্তু গুছিয়ে উঠতে পারছি না। যাইহোক, ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠে ব্রেকফাস্টে আব্বুকে দেখেই প্রশ্নটা করে বসলামঃ “আচ্ছা আব্বু প্রকৃত মুসলমান বলতে ঠিক কি বোঝায়? মানে, প্রকৃত মুসলমান কারা?

আব্বু যেন এতদিনে একটা সুযোগ পেলেন এমন ভাব করে মৃদু গলা ঝাঁকিয়ে একটু নড়েচড়ে বসলেন, “এসব তো তোমার জানার কথা! যাই হোক, জিজ্ঞাসা যখন করলে তখন শোন। আসলে মুসলমান ঘরে জন্মালেই কেউ মুসলমান হয়ে যায় না। এই যেমন তুমি, আল্লায় বিশ্বাস নেই, পরকালে বিশ্বাস নেই, নবীতে বিশ্বাস নেই; তোমাকে কি মুসলমান বলা যায়? ( তেঁতো লাগলেও গিলে ফেললাম কথাটা) আবার দ্যাখো, অনেকের আল্লাহ্‌-নবী-পরকালে বিশ্বাস তো আছে, কিন্তু কলেমাগুলোই জানে না, কোনোদিন কোরআন পড়ে নি — তাদেরকে কি মুসলমান বলা যায়?

নাহ”, ইতস্তত করেই বললাম আমি, “কিন্তু তুমি তো বললে কারা মুসলিম নয়, কিন্তু কারা মুসলিম সেইটা তো বললে না।

আচ্ছা, তবে শোন”, একটু থেমে আব্বু বলতে শুরু করলেন, “একদিন বুঝলে, জিব্রাইল এসেছেন নহানবীর কাছে সাধারণ মানুষের ছদ্মবেশে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ইসলাম কি? তখন নবী (সা) উত্তরে বললেন, তুমি আল্লাহ্‌র ইবাদত করবে। কাউকে তার শরিক করবে না। বছরের শেষে যাকাত দেবে। আর রমযান মাসে রোজা রাখবে”। একটু থেমে আবার শুরু করলেনঃ “তাহলে মুসলিম হল তারাই যারা এইসবগুলো মেনে চলে। অর্থাৎ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে হজ্জ ছাড়া বাকি যে চারটে মাস্ট, সেগুলো মানলেই তাকে মুসলিম বলা যাবে”।

–“আচ্ছা আব্বু! এসব তো শিয়ারাও করে। শিয়ারা কি মুসলিম বলে তুমি মানো? মানে, আমি সব সুন্নি মযহাবের বইতেই দেখেছি শিয়াদের পথভ্রষ্ট বলতে, এমনও বলতে দেখেছি যে তাদের স্থান দোযখে! তবে কি ওরা মুসলিম নয়?”

আব্বু মৃদু জোর গলায় বলে উঠলো, “শিয়ারা নামে মুসলিম, আসলে ওরা পথভ্রষ্ট। ওরা আল্লাহ-র শরিক করে।

— “তার মানে ওরা দোযখে যাবে”, আমি স্বগতোক্তির মতো বলে উঠলাম। তারপর অতি জিজ্ঞাসুর মতো বলে উঠলাম, “তাহলে আব্বু ধরো, একজন শিয়া আর একজন হিন্দু দুজনেই যদি জাহান্নামে যায় তাহলে শিয়াদের মুসলমান হয়ে লাভ কি হল?

— “তাহলে কি তুমি বল, নামে মুসলমান হলেই হবে?”

— “না না আমি কেন, তুমিই তো বললে যে ইবাদত-টিবাদত করলেই নাকি মুসলিম হবে। শিয়ারা তো তা করে, তাহলে ওদের মুসলিম বলবো নাকি বলবো না?”

— “খালি ইবাদত করলেই হবে? ওরা আল্লাহ-র শরিক করে যেটা ইসলামে হারাম! নবীর নির্দেশের সবগুলোই পালন করতে হবে! মুসলমান হওয়া অত সোজা নয়”।

— “তার মানে শিয়ারা আদতে মুসলমান নয়”, আমি বলতে-বলতেই দেখি আব্বু উঠে দাঁড়িয়েছেন। বললাম, “কোথায় চললে?

বললেন, “আমাকে এখুনি যেতে হবে। মাদ্রাসা যাবো। অনেকগুলো কাজ আছে। সেই দুপুরে খেয়েদেয়ে ড্রয়িং রুমে আলোচনা হবে আমি দুপুরের অপেক্ষা করতে না চাইলেও ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেওয়া ছাড়া আর উপায় ছিল না।

যাই হোক প্রবল উৎসাহে অপেক্ষা করতে লাগলাম দুপুরবেলার। তারপর যথাসময়ে খাওয়ার পরে ড্রয়িং রুমে গিয়ে দেখি হাত-ভর্তি জোয়ান নিয়ে আব্বু গদিতে আগে থেকেই রেডি। হাতের কাছে গোটা কতক বই। বুঝলাম হাতে-গরম প্রমাণ দেওয়ার জন্য রেডি হয়ে আছে। আমি উল্টোদিকের চেয়ারে বসলাম। মাঝে একটা ছোট্ট টেবিল। আমি আগের আলোচনার খেই ধরিয়ে দিয়ে বললাম, “তাহলে আব্বু তোমার কথা মতো শিয়ারা মুসলমান নয়। তাহলে কি সুন্নিরা সকলেই মুসলমান?

আব্বু ঠিক বুঝতে পারল না মনে হয়। তাই ব্যাখ্যার জন্য আমি বললাম, “আচ্ছা, সুন্নিও তো একটা সম্প্রদায় নয়, তাহলে এদের সকলেই কি প্রকৃত মুসলমান? মানে এরা তো সব করে, নবী যা যা নির্দেশ করেছেন, তাহলে এদের সকলকেই কি মুসলিম বলবো?

— “হ্যাঁ, তা তো বলতেই হবে। সুন্নিরা তো আলাদা নয় তেমন।”

এই নিয়ে বিতর্কে যেতে পারতাম, কিন্তু ইচ্ছা করেই চুপ রইলাম। আমি বললাম, “এবার মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়ার দিকে চোখ ফেরাই। আমরা কি দেখতে পাব? এরাও প্রায় সকলেই সুন্নি মযহাবের, কিন্তু এরা রামায়ণ পড়ে, রাম কে ঈশ্বরের থেকে কোনও অংশে কম করে দেখে না। এদের মতে লক্ষ্মী অর্থ ও সম্পদের দেবী। তাহলে সম্প্রদায়গত ভাবে সুন্নিদের প্রকৃত মুসলিম বলা গেলেও আসলে তো তারা স্রষ্টার শরিক করছে। তাহলে কি এদের প্রকৃত মুসলিম বলা যায়?

আব্বু বিক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলেন, “ওরা তো যতরকম হিন্দুয়ানী করা যায়, সব করে। ওরা আবার মুসলমান কিসের!

— “তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যা বিশিষ্ট দেশটি আদতে কাফেরদের দেশ, ওদেশের লোক প্রকৃত মুসলমান নয়” , বলে টলে চুপ করে গেলাম। বুঝলাম প্রসঙ্গ পাল্টাতে হবে। নয়ত আব্বু যা রাগী, আমার যত কাজ মাটি হয়ে যাবে। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা আব্বু কোনও কোনও বইতে পড়ি ইসলাম নাকি পৃথিবীর প্রাচীনতম ধর্ম, কিন্তু ইতিহাস তো বলে বেদই প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ আর সনাতন হিন্দু ধর্মই প্রাচীনতম ধর্ম। কোনটা ঠিক বলে তোমার মনে হয়?

— “আসলে নবী তো আর ইসলামের প্রথম নবী নন, উনি শেষ নবী ও মহানতম নবী। প্রথম নবী হজরত আদম। তিনিই প্রথম মুসলিম। তার সন্তান হিসাবে আমরা সকল মানুষই মুসলিম। এরপর একে একে অনেক নবী এসেছেন আল্লাহ্‌র বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। তখন থেকে এখন পর্যন্ত আল্লাহ্‌র বাণীর কোনও পরিবর্তন কিন্তু হয় নি। মানুষের মুখে মুখে এই সব বিকৃত হয়েছে দেখে আল্লাহ্‌ কোরানকে চির-অবিকৃত তৈরি করেছেন। তাই বলা যায় নাম হয়ত ইসলাম ছিল না কিন্তু বিষয়টা একই ছিল”।

আমি সহমত হতে না পেরে একটু ইতস্তত করে বললাম, “এটা তো ঠিক  মনে হল না আব্বু! যেমন ধরা যাক, আদমের সময় খৎনা তো ছিল না। তাই খৎনা-হীন আদম মুসলিম নবী ছিল একথা কিভাবে বলা যায়? আর যদি তাকে মুসলিম এবং নবী বলা যায়, তাহলে বুঝতে হবে আল্লাহ-র বাণীতে খৎনা বলে আসলে কিছুই ছিল না। আমরা এটা অনেক পরে দেখতে পাই, তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে যে এইটা আসলে মানুষের তৈরি, স্রষ্টার বাণী নয়। মূল বিষয়ে অর্থাৎ স্রষ্টা প্রদত্ত বাণীতে এটা ছিল না। তাহলে কোরআন হোক বা ইঞ্জিল, এগুলোই বিকৃত মনে করা ঠিক নয়?

— “কোরআন কখনই বিকৃত হতে পারে না”, আব্বু খুব জোরের সঙ্গে বললেও কোনও যুক্তি বা তথ্য দিল না।

আমাকে তো আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসতে হবে আব্বু কে না চটিয়ে। তাই আবার প্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা আব্বু, ইসলামের উদ্দেশ্য কি বলে তোমার মনে হয়? মানুষের মূল লক্ষ্য কি, ইসলাম তা কিভাবে পূরণ করবে?

— “দ্যাখ! মানুষ দুঃখ চায় না, সুখ এবং শান্তি চায়। এটাই মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আমরা এতসব করি সুখ-শান্তির আশায়। এই জগতে তা সম্ভব নয়। ইসলামের রাহে চললে নেকী হাসিল হয়, জান্নাত নসিব হয়। সেখানে চির-সুখ, চির-শান্তি। এইতো মানুষের লক্ষ্য।”

— “তবে কি ইসলাম ছাড়া জান্নাত পাওয়া যেতে পারে না?” আমি বলতে না বলতেই আব্বু বলে উঠলো, “কখনই না। একমাত্র ইসলামই পথ”।

আমি বললাম, “আর যদি সেই উদ্দেশ্য হাসিল না হয়, অর্থাৎ যেসব মুসলিম জান্নাতে যেতে পারবে না, তাদের সাথে অমুসলমানের পার্থক্য রইল কি?

— “বরং ভেবে দেখ, কি-জন্য তারা জান্নাতে যেতে পারবে না? নিশ্চয়ই তারা প্রকৃত মুসলিম নয়!”

— “Exactly! আমিও তো ঠিক এই কথাটাই বলতে চাইছিলাম। নবী (সা) বলেছেন, দোযখে নাকি বেশিরভাগই নারী। জান্নাতে নারীর সংখ্যা নাকি খুব কম! তাহলে বেশিরভাগ মুসলিম নারী প্রকৃতপক্ষে মুসলিম নামধারী হলেও আসলে মুসলিম নয়।”

— “না, নয়তো! এই তোমাকেই দ্যাখো কত আশা নিয়ে পড়াশুনা শেখালাম। কিন্তু আমাকে সালাম পর্যন্ত দাও না। আমার কি করার আছে, চেষ্টার তো ত্রুটি করি নি। সব কর্মের হিসাব তো ওখানেই দিতে হবে।”

— “সে আর আমি কি করবো? আমাকে আল্লাহ্‌ যেভাবে তৈরি করেছেন আমাকে তো সেইভাবেই চলতে হবে! সেটাই তো আমার নসিব! এতে আবার আমার দোষ কোথায়?”

— “মুখের উপর কথা বল না বেশি”, উত্তরটা পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজিত স্বরে বললেন, “যা জিজ্ঞাসা করছ করে নাও, যদি নজর একটু দ্বীনের দিকে একটু ফেরে!

— “তাহলে তোমার মতে মুসলমানি করার উদ্দেশ্য কি? পুরুষ শিশু যখন জন্ম নেয়, তখন তাকে মুসলমানি করা নাকি ফরয। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, তাহলে মানুষকে আল্লাহ্‌ যখন মুসলিম করে পাঠায় না, তখন অযথা খোদার উপর খোদকারী করে মুসলমানি করা কেন? বিশেষ করে এটা যখন দুনিয়ায় শিশু নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে, যা কিনা আসলে অপরাধ।

— “আল্লাহ্‌ তো নির্দেশ দিয়েছেন মুসলমানি করার।”

আমি বললাম, “তাহলে কি মুসলমানি করার আগে শিশু কি মুসলমান নয়?

— “না, নয়! বাকি আলোচনা পরে হবে সন্ধ্যায়।” আব্বু উঠে শোওয়ার ঘরের দিকে পা বাড়াল।

—->>>  খণ্ড ২

0 Shares