(নোট: মোহাম্মদ নিরক্ষর ছিলেন বলে মুসলমানরা যে কথাটি বারংবার বলে আসছেন, তাকে কেউ চ্যালেঞ্জ করছেন না। বিষয়টি নিয়ে কেউ পরখ করেও দেখছেন না। সামাজিক ইতিহাস থেকে নয় খোদ কোরআন থেকেই বিষয়টি নিয়ে চমৎকার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন বিশিষ্ট চিন্তক ইবনে কাম্মুনা। সহিহ ইন্টারন্যাশনালের অনুবাদ এখানে উপস্থান করা হয়েছে। তারপর লেখকের মতামত তফসীর আকারে দেওয়া হয়েছে। একটা মিথ্যার বেসাতির ওপর দাঁড়িয়ে মোহাম্মদকে নিরক্ষর প্রমাণ করতে চাইছেন একটি দল। তারা এই কথাটিই প্রতিষ্ঠিত করতে চান যে, কোরআন একটি ঐশি গ্রন্থ, কারণ মোহাম্মদ একজন নিরক্ষর ব্যক্তি। এই বক্তব্যের যুতসই জবাব দিয়েছেন ইবনে কাম্মুনা। তাঁর ‘দি আনলিটারেট প্রফেট’ শীর্ষক লেখাটির ভাষান্তর করার চেষ্টা করেছি।পাঠকদের মতামত আশা করছি।)

মুসলমানরা দাবি করে নবী মোহাম্মদ একজন নিরক্ষর মানুষ ছিলেন। কিন্তু এ বিষয় নিয়ে তারা বিচারমূলক সমালোচনায় যেতে রাজী হন না। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এই দাবিটা পুরোটাই ভিত্তিহীন। সত্যের চোখে ধুলি দিয়ে সাধারণ মানুষকে একটা ভুলের ওপরে রাখা হয়েছে। কিন্তু একটু মাথা খাটালেই এ ব্যাপারে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে। যে তথ্যে প্রকৃত সত্য খোলাসা হয়ে যাবে। এমনকী কোরআন এবং হাদিস থেকেও একটা ধারণা পাওয়া যাবে, আসলেই মোহাম্মদ নিরক্ষর ছিলেন নাকি এটা তার কৌশল কিংবা প্রতারণা।

আমি এখানে হাদিস এবং কোরআন থেকে এ ব্যাপারে দলিল হাজির করব, যাতে করে বোঝা যায়, আসলেই মোহাম্মদ নিরক্ষর ছিলেন কীনা। শুধু বিষয়টি পর্যালোচনা করার জন্য আমি কোরআন থেকে চারটি আয়াত উল্লেখ করব। কোরআনে ‘উম্মি’ কিংবা এর আনুষঙ্গিক (derivative) কিছু শব্দ আছে। যাকে নিরক্ষর হিসেবে ভাষান্তর করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই লেখাটিতে ওই শব্দগত দূর্বলতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হয়েছে।

কোরআনের কোন আয়াতে উম্মি (নিরক্ষর?) শব্দটি সংযুক্ত রয়েছে? আসলে এই শব্দ নিয়ে কোরআনে চারটি আয়াত রয়েছে। যেখানে তরজমায় ওই শব্দটিকে ‘নিরক্ষর’ হিসেবে ভাষান্তর করে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোরআনের এই চারটি আয়াত হল, সূরা আল বাকারা এর ৭৮ নং আয়াত, সূরা আল আরাফ এর ১৫৭ এবং ১৫৮ নং আয়াত, আর বাকিটা হল সূরা জুমুআ এর ২ নং আয়াত। যে কেউ ওই আয়াত চারটি পরখ করে দেখতে পারেন। তারা নিজে নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত হতে নিচের লিঙ্ক ভিজিট করতে পারেন:

https://quran.com/search?q=unlettered

আমার উদ্দেশ্য হল, মোহাম্মদকে ‘নিরক্ষর নবী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, তেমন শব্দটি কোরআনের যেসব আয়াতে রয়েছে, তাকে খুঁজে বের করে আনা।কোরআনের ওই উম্মি ‘নিরক্ষর’ (?) শব্দটি নিয়ে যতটা সম্ভব ব্যাখা করার চেষ্টা করা হবে এই লেখায়।

এর আগেও এইসব আয়াত নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে, নীচে তার লিঙ্ক দেওয়া হল:

১) http://www.islam-watch.org/authors/59-kammuna/1101-was-muhammad-illiterate-quranic-evidence.html

২) http://www.islam-watch.org/authors/59-kammuna/1094-was-muhammad-illiterate-hadith-evidence.html

প্রথমে কোরআনের ওইসব আয়াতের যে সহিহ ইন্টারন্যশনাল ট্রান্সস্লেশন দেওয়া হয়েছে। (তার বাংলা ভাষান্তর করা হয়েছে) পরপর আয়াতগুলোর ভাষান্তর দেওয়া হবে। এরপরপরই লেখকের ব্যাখ্যা বা তফসীর দেওয়া হয়েছে।

প্রথমেই আসি, সূরা আল বাক্বারা নিয়ে। ওই সূরার ২ নং আয়াতে সহিহ ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সলেশনে বলা হয়েছে,

”এবং তোমাদের মধ্যে যারা নিরক্ষর মানুষ আছে, তারা ইচ্ছামাফিক চিন্তা করে, কিন্তু আল্লাহর গ্রন্থের কিছুই জানেনা। তাদের কাছে কল্পনাবিলাস ছাড়া কিছুই নাই।“

(কোরআন ২:৭৮)

তফসীর

এখানে ‘গ্রন্থ’ সম্পকে বলা হয়েছে। খেয়াল করুন কোরআন সম্পর্কে বলা হয় নাই। অর্থাৎ ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে বলা হয়েছে। কারণ তখনও কোরআন গ্রন্থ হিসেবে আবির্ভূত হয় নাই। আরবিতে এর সঠিক উচ্চারণ হবে ‘উম্মিয়োনা’। এর অর্থ হল অইহুদি, মানে ইহুদি নয় এমন সম্প্রদায়। এর আরেক অর্থ দাঁড়াতে পারে ‘অজ্ঞ জনগণ’। উপরোল্লিখিত আয়াতগুলোকে যদি ভাসাভাসাভাবেও ভাষান্তর করা হয়, সেখানে উম্মিয়োনা শব্দটিকে ‘নিরক্ষর’ বলাটা সঙ্গত নয়। উল্লেখ্য যে, এই আয়াতে এমন ধরনের মানুষ সম্পর্কে বলা হয়েছে, যারা মনে করে তারা ওই গ্রন্থ সম্পর্কে জানে কিংবা তার কিছু অংশ পাঠ করেছে। এর জবাবে মোহাম্মদ তাদের বলছেন,

“না না, তোমরা ওইসব গ্রন্থ সম্পর্কে কিছুই জান না, এটা তোমাদের ইচ্ছামাফিক চিন্তা মাত্র।“

সূরা আল আরাফের ১৫৭ নং আয়াতে বলা হয়েছে, (সহিহ ইন্টারন্যশনাল ট্রান্সলেশন)

“যারা আল্লাহর রাসুলের অনুসারী,যিনি নিরক্ষর নবী। তারা তাওরাত ও বাইবেলে ওই নবী সম্পর্কে লেখা খুঁজে পাবে। যিনি সঠিক কাজ করার আদেশ দেন এবং ভুল কাজে নিষেধ করেন। ভাল জিনিশকে তাদের জন্য বৈধ করে দেন এবং খারাপ জিনিশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেন। তাদের জীবনের ওপর থেকে বোঝা নামিয়ে দেন এবং শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দেন। যা তাদের ওপর জারি ছিল। সুতরাং তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস করে, মান্য করে, সমর্থন করে এবং তার দীপ্তিকে অনুসরণ করে, যা তার ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। এসব তাদের জন্য যারা সফলতা অর্জন করতে চায়।“

তফসীর

এই আয়াতে ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের গ্রন্থে তাদের সম্পর্কে কী বলা হয়েছে, তার ইঙ্গিত রয়েছে। ওপরের আয়াতে উম্মি শব্দটির ভাষান্তর ‘নিরক্ষর’ করাটা ভুল। কারণ মোহাম্মদ নিজেকে ইহুদিদের নবী হিসেবে স্বীকার করেননি। এখানে উম্মি নবী মানে অইহুদি নবী।

কোরআনের সূরা আল আরাফের ১৫৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে, (সহিহ ইন্টারন্যশনাল ট্রান্সলেশন)

“বলে দাও, হে মানবমণ্ডলী, আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রসুল, স্বর্গ-মর্ত্য জুড়ে তার রাজত্ব। তার ছাড়া আর কারো দাসত্ব নয়। তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যুর কারণ। সুতরাং আল্লাহকে এবং তার রসুলকে বিশ্বাস কর, যিনি নিরক্ষর। যে আল্লাহ এবং তার বাণীকে বিশ্বাস করবে, তাকে অনুসরণ করবে, সেই সঠিক পথের দিশা পাবে।“

তফসীর

সূরা আল আরাফের ১৫৮ নং আয়াতটি হল একই সূরার ১৫৭ নং আয়াতের ধারাবাহিকতা। এখানেও ‘উম্মি নবী’ শব্দটি তার অর্থের পরিবর্তন ঘটায় নাই। সুতরাং এখানে ‘নিরক্ষর নবী’  হিসেবে ভাষান্তর করা ভুল। এর সঠিক অর্থ হবে ‘অইহুদি নবী’।

কোরআনের সূরা আল জুমআ’র ২ নং আয়াতে ‘উম্মিয়েনা’দের মধ্য থেকে একজন রসুল প্রেরণের কথা বলা হয়েছে। কোরআনের সূরা আল জুমআ’র ২ নং আয়াতের সহিহ ইন্টারন্যাশনাল অনুবাদে বলা হয়েছে-

“তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রসুল প্রেরণ করেছেন। যারা তার আয়াতের মধ্য থেকে পাঠ করেন, তাদের বিশুদ্ধ করেন। তাদের গ্রন্থ এবং জ্ঞান সম্পর্কে শিক্ষা দেন। ইতোপূর্বে এরা ছিল সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে।“

তফসীর

ওপরের কয়েক আয়াতের প্রেক্ষাপটে এখানেও ‘উম্মিয়োনা’ শব্দটি চলে এসেছে। এখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ ওই ‘উম্মিয়েনা’দের (অইহুদি) মধ্যে থেকে তাদের জন্যই নবী পাঠিয়েছেন। এটা নিশ্চিত নয় যে, সকল আরবদের মধ্যে মোহাম্মদ নিরক্ষর ছিল। তারচেয়ে বরং ওই আয়াতে যা বলা হয়েছে, তা হল ‘আমরা অইহুদীদের জন্য একজন নবী পাঠিয়েছি। এবং সেটা তাদের ভেতর থেকেই (মোহাম্মদ নিজেই একজন অইহুদি)। কোরআনের কোনো একটিও আয়াত নাই, যেখানে মোহাম্মদকে ‘নিরক্ষর’ বলা হয়েছে। তারা অযথা মোহাম্মদকে নিরক্ষর করার চেষ্টা করে চলেছেন।

 

সোহেল চৌধুরী এর ব্লগ   ৫৩৩ বার পঠিত