কনফুসিয়াস

 

 

এই পৃথিবীর ইতিহাসে যতো মানুষকে শুধু ধর্মের কারণে হত্যা করা হয়েছে আর কোনও কারণে বোধ করি হয় নাই। তবুও মানুষ বারবার কেন যে এই ধর্মের কাছেই ফিরে ফিরে এসেছে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে। মানুষের কী আর কোথাও যাবার মতো জায়গা ছিলো না?

আমার’তো মনে হয় মানুষের ধর্ম ছাড়াও আশ্রয় নেবার মতো একটি অপূর্ব জায়গা অতীতেও ছিলো, এখনো আছে; ভবিষ্যতেও থাকবে।

আর সেই জায়গাটার নাম হলো ‘ভালোবাসা‘।

ধর্ম হচ্ছে জেলখানার মতো। আর ভালোবাসা হলো মায়ের মতো। থানার কয়েদিদের মতো- একই কাপড় পড়ে, এক সারিতে চলে, একই খাবার খেয়ে, এক জায়গায় জড়ো হয়ে, একই কথা বলে- মানুষ কেন এই পাহাড়, পর্বত, নদী, জোছনার বিচিত্র পৃথিবীতে এসেছে? তাঁরা মায়ের বিছানার মতো কেন পৃথিবীর বিছানায় গড়াগড়ি করে না? তাঁরা কেন প্রকৃতি মায়ের কাছে স্বাধীন শিশুর মতো দুরন্ত ভালোবাসায় বিশ্বাস করে না? মানুষের সমস্যাটা কী?

ধর্ম যতবার যুদ্ধ করেছে, মানুষের গলা কেটেছে, পাথর মেরে মেরে হত্যা করেছে, অপরিণত শিশুদের ভোগ করেছে, ধর্ষণ করেছে, বলি দিয়েছে, সহমরণের চিতায় নিয়েছে, ঠিক ততোবার ভালোবাসা এসে যদি সেই ক্ষতে তাঁর স্পর্ষ না রাখতো তাহলে মানুষ এতদিনে পাগল হয়ে যেতো। ধর্মের প্রথা, নিয়ম, বিধি-নিষেধ মানতে মানতে তাঁরা জম্বি হয়ে যেতো।

ধর্ম সৃষ্টি হয়েছে- সৃষ্টার প্রতি তাঁর সৃষ্টির ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্যে। আবার অন্যভাবে দেখলে- সৃষ্টার ভালোবাসা পাবার উপায়ও সেই ধর্মই।

তাহলে উভয়দিক থেকেই ধর্মের মূল উদ্দেশ্যটা ছিলো ভালোবাসা। ধর্ম হলো এখানে ভালোবাসা প্রকাশের একটি উপায় বা মাধ্যমমাত্র। কিন্তু ধর্মের পথ আর আইন সেই উদ্দেশ্যে পৌঁছানোর উপায়টিকেই উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলেছে। ধর্মে এখন আপনি সবকিছু পাবেন শুধু ভালোবাসা পাবেন না। ধর্ম যেনো সেইসব মমিদের মতো, যাদের দেহ হাজার বছর ধরে শুধু টিকেই আছে, কিন্তু সেই দেহের আত্মাটা আজ আর নেই।

ধর্ম মানব সভ্যতার কোনও কাজে এখন আর আসছে না। শুধু যুদ্ধ লাগানো ছাড়া আর অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাস্টমার হওয়া ছাড়া। অথচ অধার্মিক সভ্যতার সকল উপকরণ ধর্মের ঠিকই কাজে লাগছে। ধর্মের এখন এসি লাগে, আইফোন লাগে, গাড়ি লাগে, বাড়ি লাগে, ব্যাংক একাউন্ট লাগে, সিসি ক্যামেরা লাগে, সিকিউরিটি লাগে, পুলিশ লাগে, চপার লাগে। ধর্ম বর্তমান পৃথিবীতে পুঁজিবিহীন বিলিয়ন ডলারের একটি ব্যবসা। এই ব্যবসায় আপনার চাই কিছু অন্ধ ভক্ত। যারা অন্য ধর্মের নামে হিংসা ছড়াবে আর তাদের পেশীশক্তি দিয়ে নিজের ধর্মের অপার শান্তির কথা বোঝাবে।

ধর্ম আপনাকে বেটোফেনের নাইন্থ সিম্ফনি শেখাবে না। ধর্ম আপনাকে মোনালিসা আঁকা শেখাবে না। ধর্ম আপনাকে বড়জোড় অস্ত্র ধরা শেখাবে।

এই পৃথিবীতে যতো শৈল্পিক মানবিক কাজ হয়েছে তাতে মোল্লা, পুরোহিত, ফাদার, ভিক্ষুদের চেয়েও সাধারণ মানুষের অবদান অনেক অনেক অনেক বেশি ছিল।

তাই এটা পরিস্কার বোঝা যায় ধর্ম ছাড়াও পৃথিবী দিব্বি চলতে পারে। কিন্তু ধর্মের নিজেকে চালাতে গেলে সাধারণ মানুষের আশ্রয় প্রশ্রয় ছাড়া গতি নেই।

 

ধর্ম কী?

ধর্ম হলো গণ্ডিবদ্ধ, শ্রেণিবদ্ধ, আচার, প্রথা, গোত্র বা জাতিভিত্তিক একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বিশ্বাস আচরণ বা আইন। যা কখনোই সমগ্রবিশ্বের মানুষের জন্য নয়, ছিলও না। ধর্ম সবসময়ই আঞ্চলিক। ধর্ম বৈশ্বয়িক নয়। হতে পারেনি কোনও দিন।

আর ভালোবাসা হচ্ছে- রবি ঠাকুরের এই লাইনগুলির মতো –

“বিশ্বজনের পায়ের তলে ধূলিময় যে ভূমি

সেই তো স্বর্গভূমি।

সবায় নিয়ে সবার মাঝে লুকিয়ে আছ তুমি

সেই তো আমার তুমি।”

যেখানে রাষ্ট্র বা সমাজ কেবল ধর্মের নামে চলে। সেখানে আর যাইহোক ভালোবাসার বন্ধন কাজ করে না। সহিষ্ণুতা কাজ করে না। সহাবস্থান কাজ করে না। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ আরব দেশগুলি। যেখানে তাঁদের ধর্ম এক, ভাষা এক, আচরণ-প্রথা- খাদ্যাভ্যাস এক, ঋতু এক, তবুও মাত্র ৩৮৪ মিলিয়ন লোক আলাদা আলাদা বিশটি দেশ বানিয়ে ঝগড়া ফ্যাসাদে নিত্য দিন কাটাচ্ছে। ধর্মের নামে পাকিস্তান ৫০০০ বছরের ভারত’কে কেটে তিন টুকরো করেছে। তারপরেও ভারতে ১৩৪২ মিলিয়ন নানা জাতি ভাষা ধর্মের লোক ঠিকই একসাথে বাস করছে। কারণ এই দেশ ধর্মের নামে না দেশের প্রতি ভালোবাসায় পরিচালিত হয়। চীনের মতো ১৩৮৮ মিলিয়ন লোকের দেশেও নানান জাতি ভাষা ধর্মের লোক বসবাস করে। কারণ তারাও ধর্মের নামে দেশ পরিচালনা করে না।

যতদিন ধর্ম থাকবে ততদিন দেশ ভাগ হবে। মন্দির ভেঙ্গে মসজিদ হবে। মসজিদ ভেঙ্গে হবে মন্দিরের জায়গা দখল। লক্ষ লক্ষ লোক রিফ্যুজি হবে। যুদ্ধ হবে, হাজার হাজার মানুষ ছোট্ট ভেলায় পাটের স্তুপের মতো ঠাসাঠাসি করে বিপুল সমুদ্রে তার সব ফেলে অজানার উদ্দেশে ভাসবে এবং ডুবে মরে যাবে। যতদিন ধর্ম থাকবে ততদিন পারমানবিক বোমাগুলির চোখে ঘুম আসবে না। তাঁরা নির্ঘুম জেগে থাকবে।

বাউল লালন ফকির বলেছিলেন-

“এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে

যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে…”

এই পৃথিবীও যদি এই বাউলের কথাটি বুঝতো তাহলে সমস্ত জেনারেল আর ফিল্ড মার্শালের এতোদিনে রিটায়েরমেন্ট হতো।

কিছু তরুণ তরুণীও যদি মানুষের গলা না কেটে এটা বুঝতো যে, ভালোবাসা মানে- লাভ জিহাদ নয়।

যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায়– এটাই ভালোবাসা।

যতোদিন না আমরা একটি ভালোবাসাময় পৃথিবী তৈরীর স্বপ্ন না দেখবো, ততোদিন পর্যন্ত ধর্মের কারণে যত লক্ষ কোটি মানুষ তাদের সময়ের আগে নৃশংসভাবে হত্যা হয়েছে, তারা আমাদের ক্ষমা করবে না। ধর্মহীন ভালোবাসাময় পৃথিবীই লক্ষ লক্ষ বছর মানুষের পৃথিবী ছিল। আমাদের শুধু প্রার্থনা করার মতো একটি অসার বিষয়ের জন্য মানবজাতির হুমকিস্বরূপ এই ধর্মের আর প্রয়োজন নেই। আমাদের চেষ্টা আমাদের কাজ আমাদের বিজ্ঞান আমাদের ভালোবাসাই আমাদের সকলের ভালো থাকার জন্য যথেষ্ট।

কনফুসিয়াস এর ব্লগ   ৯৬ বার পঠিত