রূপালী ঘুড়ি

“ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়

চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয় –

চান্নি পসর চান্নি পসর, আহারে আলো …

কে বেসেছে কে বেসেছে তাহারে ভালো ।

কে দিয়েছে নিশি রাইতে দুধের চাদর গায়ে …

কে খেলেছে চন্দ্র খেলা ধবল ছায়ায় –

এখন খেলা থেমে গেছে মুছে গেছে রঙ,

অনেক দূরে বাজছে ঘন্টা ঢং ঢং …

এখন যাবো অচিন দেশে অচিন কোন গাঁয়ে,

চন্দ্র কারিগরের কাছে ধবল পঙ্খী নায়ে …

ও কারিগর, দয়ার সাগর, ওগো দয়াময়

চান্নি পসর রাইতে যেন আমার মরণ হয় –

(এই গান তাঁরই এক বই থেকে সংগ্রহ করা নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারলাম না)

একটু আগে খবর পেলাম হুমায়ুন আহমেদ আর নেই। তিনি নেই, আর কোনোদিন আমাদের মাঝে আসবেন না।

ক্যান্সার নামক মরন ব্যাধির সাথে লড়াই করে তিনি হেরে গেলেন।

চায়ের টেবিলে তাঁর লেখা নিয়ে আর ঝড় উঠবেনা। তবে তাঁর এই মৃত্যুর খবর যেন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল। ছড়িয়ে পড়ল অসংখ্য ভক্তদের মাঝে।

মনে পড়ে অনেক ছোট বেলায় তাঁর এক বই দিয়ে তাঁর বই পড়ার যাত্রা শুরু। বইটার নাম ছিল নন্দিত নরকে। এক মধ্যবিত্ত সংসারের সুখ-দুঃখ নিয়ে এক অনবদ্য বই। যা এখনো অনেকের মন জূড়ে হৃদয় জূড়ে স্থান করে নিয়েছে।

আমি যখন এই খবর নিয়ে লিখতে বসেছি, এখন অনেক রাত। তবু মন বলে কথা। মনে পড়ল এইতো ক’দিন আগে তিনি এসেছিলেন। বলে গিয়েছিলেন তাঁর অনেক অসমাপ্ত কাজ তিনি সমাধান করবেন একটু ভালো হয়ে উঠলেই।

মধ্যবিত্ত পরিবারকে নিয়ে এমন লেখা বোধ করি অনেক লেখক এমন নিপূণ ভাবে লিখেছেন কিনা জানিনা।

এই মহান লেখক, চিত্রকার, নাট্যকার, এর সম্পর্কে আর কীবা তথ্য দেব। ইচ্ছে করলেই পাওয়া যাবে তাঁর লেখক জীবনের, শিক্ষা জীবনের সব তথ্য। তবু আর একবার দ্বারস্ত হলাম ইন্টারনেট এর।

হুমায়ূন আহমেদ (১৩ নভেম্বর, ১৯৪৮১৯ জুলাই, ২০১২) বিংশ শতাব্দীর বাঙ্গালি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং নাট্যকার। বলা হয়, বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের তিনি পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি সমাদৃত। ২০১১ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। অতুলনীয় জনপ্রিয়তা সত্বেও তিনি অন্তরাল জীবন-যাপন করেন এবং লেখলেখি ও চিত্রনির্মাণের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাকে আটক করে এবং নির্যাতনের পর হত্যার জন্য গুলি চালায়। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ২০১১-এর সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর দেহে আন্ত্রীয় ক্যান্সার ধরা পড়ে। তবে টিউমার বাইরে ছড়িয়ে না-পড়ায় সহজে তাঁর চিকিৎসা সম্ভব হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসাবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন।[২] হুমায়ূন আহমেদ ২০১২ খ্রিস্টাব্দের শুরুতে জাতিসংঘে বাংলাদেশ দূতাবাসে সিনিয়র স্পেশাল অ্যাডভাইজারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।[৩] জুলাই ১৯,২০১২ এই নন্দিত লেখক ক্যান্সার নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে মৃত্যু বরন করেন।

২৩ জুলাই

রোজ সোমবার তার মরদেহ  আসে বাংলাদেশে। লাখো মানুষের ঢল নেমে  আসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বিস্মিত, আবেগপ্লুত হয়ে দেখেছি, শিশু  যুবক সেই পঞ্চগড় থেকে আসা বৃদ্ধ রয়েছেন তাদের কাতারে।

নিজে অশ্রুসিক্ত হয়ে দেখেছি সমস্ত অনুষ্ঠান। সবাই শদ্ধাঞ্জলি দিতে, এক নজর তার কফিনকে ছুয়ে দেখতে এসেছে। কী অবিশ্বাস্য!

এও কী সম্ভব? কিন্তু সবই সম্ভব হয়েছে। তিনি যে অগনতি পাঠক, ভক্ত তৈ্রী করে গিয়েছেন, তা আমাদের  কল্পনার বাইরে ছিল। যদি না নিজে চোখে না দেখতাম।

তাঁকে কোথায় সমাহিত করা হবে এই নিয়ে পারিবারিক সমস্যা দেখা দেয়ায় বারডেম হাসপাতালে তাঁর দেহ রেখে দেয়া হল।

২৪ জুলাই-

আজ তাঁকে সমাহিত করা হবে তার প্রিয় স্থান, তাঁর নিজের হাতে গড়া নুহাশ পল্লীতে। আসলে অনেক সময় কথা বেশী থাকলে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। আমি ভেবেছিলাম আজ অনেক কিছুই লিখব, বা স্মৃতিচারণ করব। তা আর সম্ভব হচ্ছে না। বইমেলা মানেই ছিল হুমায়ুন আহমেদ, তা হয়তো স্তিমিত হয়ে যাবে। বা যাবে না।

তবে আজ সে কথা থাক। আজ কেবলই মন খারাপের পালা। তিনি নেই আমাদের মাঝে। একদিন আমরা ও এমন ভাবেই চলে যাবো।

তিনি মনে করিয়ে দিলেন পৃথিবীতে কেউ অমর নয়। অমর তার কার্যক্রম। আজ কেবল মন খারাপের পালা-

‘”দিবোনা যেতে”

 নাহি   শুনে কেউ,

নাহি কোনো সাড়া।

চারিদিক  হতে আজি

অবশ্রাম কর্ণে উঠিতেছে বাজি

সেই  বিশ্বমর্মরভেদী করুণ ক্রন্দন।

“যেতে নাহি দেব”

0 Shares

রূপালী ঘুড়ি এর ব্লগ   ৩৫ বার পঠিত