কাকন রেজা

আজ ২১ জুন। জুন মাসের তৃতীয় রবিবার, ‘বাবা দিবস’। দু’বছর আগেও পৃথিবীতে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ‘বাবা’ মনে হতো নিজেকে। আজ সবচেয়ে দুর্ভাগা। আজ আমাকে ‘হ্যাপি ফাদারস ডে’ বলবে না আমার ফাগুন। ২১ তারিখটা আমার জন্য অসহনীয় যাতনার। কারণ ২১ মে ফাগুন আমার কাছ থেকে চলে গিয়েছিলো। সেই থেকে প্রতিমাসেই মুখোমুখি হতে হয় এ তারিখটির। এবার সেই ২১ তারিখেই ‘বাবা দিবস’। দ্বিগুন যন্ত্রণার মুখোমুখি। সেদিন সকালে বাসা থেকে গলির মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলাম ওকে। প্রার্থনা করেছিলাম রাতে যেনো সুস্থ শরীরে বাসায় ফিরে আসে। আসেনি।

হ্যাঁ, ইহসান ইবনে রেজা, ফাগুন রেজা’র কথা বলছি। ওর গুপ্তহত্যার আজ তেরো মাস হতে চললো। না, এখনো হত্যাকারী ধরা পড়েনি। ধরার চেষ্টাও যে খুব আছে তাও বলা যাবে না। বলতেও চাই না। বিশেষ করে এই করোনাকালে। যখন মৃত্যুটাই মানুষের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনের কাছে আমার ছেলেটা ছিলো শুধুমাত্র একটা সংখ্যা। হয়তো অন্যদের কাছেও তাই। অথচ আজ প্রতিটা মানুষই সংখ্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয় আক্রান্তের সংখ্যা, নয় মৃতের।

ফাগুন রেজা’র কথা এমন সময়ে মনে রাখার ফুসরতই কোথায় মানুষের, সবাইতো নিজেকে বাঁচানোয় ব্যস্ত। অবশ্য এর আগেও অনেকেই নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত ছিলেন। এখন সবাই। প্রতিভাবান, সৎ এক কথায় ঋজু একজন গণমাধ্যমকর্মী নিখোঁজ হয়ে গেলেন। তারপর তার মৃতদেহ পাওয়া গেলো রেললাইনের পার্শ্বে। তাকে বেওয়ারিশ হিসাবে দাফনের চেষ্টা করা হলো। একটা বছর হয়ে যাবার পরও হত্যাকান্ডের কোনো সুরাহা হলো না। খুনিচক্র চিহ্নিত হবার পরও গ্রেপ্তার হলো না। জানা গেলো না এর পেছনের কাহিনি, ব্যাকস্টেজে কী ছিলো! বিস্ময়ের নয় কি? অবশ্য বিস্ময়েরই বলি কীভাবে, দৃষ্টান্ত তো আরো আছে বিচারহীনতার।

যাক গে, এই ‘বাবা দিবসে’ বাবা হিসাবে আমার স্মৃতির কথা বলি। কোনবারই ‘বাবা দিবসে’ ফাগুনের ‘উইশ’ থেকে বঞ্চিত হইনি। শেষবার, এখনো কানে লেগে আছে ‘হ্যাপি ফাদার্স ডে আব্বুজি’। মৃদুস্বরে ফোনে বলা ফাগুনের সেই ‘উইশ’। গত বছর ‘বাবা দিবস’ গেছে, আমি বাবা হয়ে উঠতে পারিনি। ফাগুন ‘উইশ’ না করলে কীভাবে বাবা হয়ে উঠি। এবারও আমার বাবা হয়ে উঠে হবে না, ফাগুন বলবে না, ‘হ্যাপি ফাদার্স ডে আব্বুজি’। এ কষ্ট কাউকে বোঝানোর নয়। শুধু বুঝবেন আমার সমগোত্রীয়রা, যাদের বাবা হয়ে উঠা হবে না কোনো ‘বাবা দিবসে’ই।

একুশ তারিখটা অনেকেই সৌভাগ্যের বলেন। তিনটা সাতের সমন্বয়ে একুশ হয়। সাত হলো সৌভাগ্যের সংখ্যা, তাই এমনটা ধারণা কারো কারো। অথচ এই সংখ্যাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের। মাসের একুশ তারিখটা আসলেই অজান্তেই লিখতে বসে যাই। হয়তো এটাও এক ধরণের আত্মরক্ষা। নিজের কাছ থেকে নিজের। সহ্যসীমার বাইরের যাতনাটা ভাগ করে নেয়ার একটা চেষ্টা। কষ্ট ভাগ হলে কমে যায়, এমন ধারণার প্রয়াস। সত্যি কমে কি? কমলে প্রতিবারই ভাগ করতে হয় কেনো?

ফাগুন ছিলো আমার ভালো অংশটা। ও নিজে বলতো, ‘আমি আব্বুজির মতো হয়েছি’। কিন্তু আমি তো জানি, ও আমার শুদ্ধ অংশ। আমার চেয়েও হাজারগুন বিশুদ্ধ ও শানিত। কোনো অন্যায়কে কখনো প্রশ্রয় দেয়নি আমার ফাগুন। এই অল্প বয়সে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ শুরু করেছিলো গণমাধ্যমে। কাজেই দৃষ্টি কেড়েছিলো সবার। যারা ওকে জেনেছেন, তারাই বলেছেন ফাগুনের ঋজুতার কথা। ফাগুন চেয়েছিলো বিশুদ্ধ গণমাধ্যম। নিজের শুদ্ধতাকে দিয়ে ইংরেজি গণমাধ্যমকে বিশুদ্ধ করার ইচ্ছে ছিলো তার। ওর চমৎকার ইংরেজির প্রশংসা শুনি আজও। এখনো অনেকেই ভুলেননি ফাগুনকে। তার সহকর্মী, তার বন্ধু, তার পরিচিত অনেকেই মনে রেখেছেন তাকে। তার ডেডিকেশন, কমিটমেন্ট-কে ভুলে যাওয়া খুব সহজতো নয়। তাহলে বলুন তো, আমি ভুলি কীভাবে? আমি তো ওর মাধ্যমেই বাবা হয়েছি। ‘আব্বুজি’ ডাকটা তো ওর কাছ থেকেই প্রথম শোনা। পিতৃত্বের প্রথম অনুভূতিই আমার ফাগুন। বলুন তো ‘বাবা দিবসে’ আমার কি কখনো আর ‘বাবা’ হয়ে উঠা হবে? হয়ে উঠা হবে না, হয়ে উঠা হয় না।

0 Shares
কাকন রেজা এর ব্লগ   ৪৫ বার পঠিত